Page Nav

HIDE

Grid Style

GRID_STYLE

Post/Page

Weather Location

Breaking News:

latest

কিছু শিক্ষক কখনোই অবসর নেন না — আশিস কুমার প

কিছু শিক্ষক কখনোই অবসর নেন না — আশিস কুমার পণ্ডা
একদিন সকালে শর্মিলা নামে এক বারো ক্লাসের ছাত্রী স্কুলের ক্যাম্পাসে হাঁটছিল। হঠাৎ সে দেখল, তার শিক্ষিকা স্বপ্না দিদিমনি  খুব যত্ন করে কয়েকটি গাছের পরিচর্যা করছেন।কৌতূহল সামলাতে না প…

 




কিছু শিক্ষক কখনোই অবসর নেন না — আশিস কুমার পণ্ডা


একদিন সকালে শর্মিলা নামে এক বারো ক্লাসের ছাত্রী স্কুলের ক্যাম্পাসে হাঁটছিল। হঠাৎ সে দেখল, তার শিক্ষিকা স্বপ্না দিদিমনি  খুব যত্ন করে কয়েকটি গাছের পরিচর্যা করছেন।

কৌতূহল সামলাতে না পেরে সে এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসা করল, “দিদিমনি , আমাদের স্কুলে তো অনেক গাছপালা আছে। সেগুলোর দেখাশোনা তো মালিকাকু করেন। কিন্তু সবাই বলে, এই গাছগুলো আপনি নিজে দেখেন। এদের মধ্যে এমন কী বিশেষ আছে?”

স্বপ্না দিদিমনি  মুচকি হেসে একটি বড় গাছের দিকে ইশারা করে বললেন, “এই গাছটাকে চেনো?”

— “আমগাছ,” আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে উত্তর দিল শর্মিলা।

দিদিমনি  মাথা নেড়ে বললেন, “না, এ হলো অরুণিমা।” তারপর আরেকটি গাছের দিকে দেখিয়ে বললেন, “আর এ হলো সুশান্ত।”

শর্মিলা অবাক হয়ে বলল, “অরুণিমা? সুশান্ত? এগুলো তো মানুষের নাম!”

— “ঠিক তাই,” বললেন দিদিমনি। তিনি ধীরে ধীরে গাছগুলোর মাঝ দিয়ে হাঁটতে লাগলেন। স্নেহভরে একেকটি গাছের গুঁড়ি স্পর্শ করছিলেন, যেন বহু বছর পর পুরোনো বন্ধুদের খোঁজ নিচ্ছেন।

— “এই গাছটা রুমা। ওটা রঞ্জন সেন। আর এটা পার্থ। ওদিকে শ্বেতা। ওরা সবাই ১৯৭৮ সালের ব্যাচের ছাত্রছাত্রী—আমি যে প্রথম ব্যাচকে পড়িয়েছিলাম। ওরাই আমাকে শিক্ষক হতে শিখিয়েছিল।”

প্রতিটি গাছের ছিল একটি গল্প। প্রতিটি গাছ বহন করছিল একটি স্মৃতি। প্রতিটি গাছ ছিল এমন একজন মানুষের প্রতীক, যার জীবন গঠনে তিনি একসময় ভূমিকা রেখেছিলেন।

ঠিক তখনই স্কুলের ঘণ্টা বেজে উঠল। স্বপ্না দিদিমনি  ক্লাস নিতে চলে গেলেন। কিন্তু শর্মিলার কৌতূহল কাটল না। সে মালি-কাকুর কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করল, “কাকু, এই গাছগুলোর সঙ্গে ১৯৭৮ সালের ব্যাচের কী সম্পর্ক?”

মালি হেসে বললেন, “ওই ব্যাচ যখন স্কুল ছাড়ে, তখন প্রত্যেক ছাত্রছাত্রী দিদিমনিকে নিজের নামে একটি করে চারা গাছ উপহার দিয়েছিল। ছাত্রছাত্রীরা নিজেদের জীবন নিয়ে এগিয়ে গেছে, কিন্তু দিদিমনি এখানেই থেকে গেছেন। এই গাছগুলোর যত্ন করেছেন, ঠিক যেমন একসময় তাঁদের যত্ন করতেন।”

শর্মিলা মুচকি হাসল। তারপরেই, মালি-কাকুর মুখটা একটু গম্ভীর হয়ে গেল।

— “তবে এবার দিদিমণিরও ওদের ছেড়ে যাওয়ার সময় হয়েছে। আগামী সপ্তাহেই তাঁর অবসর।”

কথাটা শর্মিলার মনে গেঁথে রইল।

এক সপ্তাহ পরে স্বপ্না ম্যাডামের বিদায় সংবর্ধনায় স্কুলের অডিটোরিয়াম ভরে গেল ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক ও প্রাক্তন সহকর্মীদের উপস্থিতিতে।

অনুষ্ঠান শেষে তিনি নিঃশব্দে বাগানে চলে এলেন। এক এক করে তাঁর প্রিয় গাছগুলোর গায়ে হাত বুলিয়ে দিয়ে এগিয়ে চললেন। ত্রিশ বছরের স্মৃতি যেন পাতায় পাতায় ফিসফিস করে গল্প বলে যাচ্ছিল। হয়তো এটাই ছিল শেষবার, যখন তিনি এই গাছগুলোর পরিচর্যাকারী হিসেবে তাদের মাঝে হাঁটছিলেন।

হঠাৎ নীরবতা ভেঙে একটি কণ্ঠস্বর ভেসে এল।

— “দিদিমনি , কেমন আছেন?”

তিনি ফিরে দেখলেন, এক ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে আছেন।

— “দুঃখিত,” তিনি মৃদু হেসে বললেন, “আমি আপনাকে ঠিক চিনতে পারছি না।”

লোকটি হাসলেন। উত্তর দেওয়ার আগেই শর্মিলা এগিয়ে এসে বলল, — “চিনবেন কী করে, দিদিমনি ? আপনার চারাগাছগুলো তো এখন বড় বড় গাছ হয়ে গেছে।”

ভদ্রলোকের চোখ ভিজে উঠল।

— “সুশান্ত সিং।”

এক মুহূর্তের জন্য স্বপ্না দিদিমনি তাঁর দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর মুখে হাসি ফুটে উঠল।

— “রোল নম্বর ১২। সব সময় গণিতের হোম ওয়ার্ক জমা দিতে দেরি করতে।”

চারদিকে হাসির রোল উঠল। আরেকটি গলা শোনা গেল।

— “শ্বেতা ভার্মা।”

তারপর আরেকজন।

— “ড. পার্থ রায়, দিদিমনি।”

একে একে পুরনো ছাত্ররা এগিয়ে আসতে লাগল — প্রশাসক, ডাক্তার, ব্যবসায়ী, শিক্ষক, ইঞ্জিনিয়ার, বাবা-মা। একসময় যারা তাঁর ক্লাসরুমে বসে স্বপ্ন দেখতে শিখেছিল, তারাই আজ জীবনের নানা ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত মানুষ।

স্বপ্না দিদিমণির চোখে জল ভরে এল। তারপর তিনি আরও সুন্দর এক দৃশ্য দেখলেন। ১৯৭৮ সালের ব্যাচের পাশে দাঁড়িয়ে আছে শর্মিলা আর তার সহপাঠীরা। অতীত আর ভবিষ্যৎ যেন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে। তাঁর শিক্ষকজীবনের প্রথম অধ্যায় আর শেষ অধ্যায় যেন সেদিন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ছিল।

"এসব তুমি করেছ?" তিনি জিজ্ঞেস করলেন।

শর্মিলা মাথা নাড়ল, "হ্যাঁ দিদিমণি। এটা আমাদের তরফ থেকে আপনার বিদায়-উপহার। ২০০৮ সালের ব্যাচ একসাথে করেছে ১৯৭৮ সালের ব্যাচকে।"

সেই মুহূর্তে স্বপ্না দিদিমনি  আর চোখের জল ধরে রাখতে পারলেন না। তিনি উপলব্ধি করলেন এমন একটি সত্য, যা প্রত্যেক মহান শিক্ষক একদিন না একদিন বুঝতে পারেন—

একজন শিক্ষকের চাকরি শেষ হয়।

শিক্ষক ক্লাসরুম থেকে অবসর নেন।

কিন্তু একজন শিক্ষক কখনোই সত্যিকারের সেই জীবনগুলো থেকে চলে যান না, যাদের তিনি ছুঁয়ে গেছেন।

বছর পেরিয়ে যায়।

মুখ বদলে যায়।

কিশোর কিশোরীরা বড় হয়ে যায়।

কিন্তু স্মৃতিগুলো থেকে যায়।

ঠিক সেই চারাগাছগুলোর মতোই, ছাত্রছাত্রীরাও একদিন বড় গাছে পরিণত হয়—ছায়া দেয়, ফল দেয়, আর অন্যের জীবনে নতুন বীজ বপন করে।

আর তাই কিছু শিক্ষক কখনোই সত্যি অবসর নেন না। তাঁরা শুধু শ্রেণিকক্ষ ছেড়ে যান। কিন্তু থেকে যান তাঁদের ছাত্রদের হৃদয়ে, চিন্তায়, মূল্যবোধে এবং জীবনের প্রতিটি সাফল্যের গল্পে। স্কুলের শেষ ঘণ্টা একদিন বেজে ওঠে ঠিকই, কিন্তু একজন প্রকৃত শিক্ষকের শিক্ষা, ভালোবাসা আর প্রভাবের শেষ ঘণ্টা কখনও বাজে না।

No comments