১০০টি ‘না’-এর গল্প—আশিস কুমার পণ্ডা
এক রবিবার সকালে একজন মহিলা সুপারমার্কেটে গিয়েছিলেন। দরজার কাছে তিনি দেখলেন পাঁচ-ছয় বছরের একটি ছোট ছেলে দাঁড়িয়ে আছে। তার সামনে এক বাক্স স্ন্যাকস আর একটি গলায় ঝোলানো হাতে লেখা বোর্ড, তাতে লেখা…
১০০টি ‘না’-এর গল্প—আশিস কুমার পণ্ডা
এক রবিবার সকালে একজন মহিলা সুপারমার্কেটে গিয়েছিলেন। দরজার কাছে তিনি দেখলেন পাঁচ-ছয় বছরের একটি ছোট ছেলে দাঁড়িয়ে আছে। তার সামনে এক বাক্স স্ন্যাকস আর একটি গলায় ঝোলানো হাতে লেখা বোর্ড, তাতে লেখা —
"প্রতি প্যাকেট ২০ টাকা — স্কাউটস চ্যারিটি ফান্ড।"
স্কুলের একটি তহবিল সংগ্রহ কর্মসূচির জন্য ছেলেটি স্ন্যাকস বিক্রি করছিল। অনেক মানুষ তার পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন। কিন্তু ছেলেটি অবিশ্বাস্য আত্মবিশ্বাস নিয়ে একের পর এক সবার কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করছিল, "একটা প্যাকেট নেবেন?"
কেউ কেউ কিনছিলেন। অনেকে উত্তর দিচ্ছিলেন না। কেউ কেউ হেসে বলছিলেন, "না বাবা, আজ না।"
কিন্তু মহিলার নজর কাড়ল অন্য একটি বিষয়। কেউ ‘না’ বললেও ছেলেটি মন খারাপ করছিল না। হেসে তার নোটবুকে একটা করে দাগ দিচ্ছিল, আর একই উৎসাহ নিয়ে পরের জনের কাছে চলে যাচ্ছিল।
কৌতূহলী হয়ে মহিলাও একটি প্যাকেট কিনলেন। ছেলেটির মুখ আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
“ধন্যবাদ, আন্টি!” — সে বলল।
মহিলা জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার এখনও কতগুলো প্যাকেট বিক্রি করা বাকি?”
ছেলেটি কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, “জানি না।”
মহিলা হেসে আবার জিজ্ঞেস করলেন, “তাহলে তুমি এখানে কতক্ষণ থাকবে?”
ছেলেটি বলল, "যতক্ষণ না ১০০ জন আমাকে 'না' বলেন।"
উত্তরটা শুনে মহিলা কয়েক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেলেন। তার বিস্মিত মুখ দেখে ছেলেটির পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটির শিক্ষক এগিয়ে এসে বললেন, “ও কতগুলো প্যাকেট বিক্রি করল, সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। আমরা চাই, ছোটবেলা থেকেই ও শিখুক কীভাবে ‘না’ শুনতে হয়, সেটাকে মেনে নিতে হয়, আর তারপরও পরের মানুষের কাছে যাওয়ার সাহস রাখতে হয়।”
কী অসাধারণ শিক্ষা!
আমরা বাবা-মা, শিক্ষক বা অভিভাবক হিসেবে শিশুদের সফল হওয়ার শিক্ষা দিই। তাদের বলি, “বেশি নম্বর পাও, কম্পিটিশন জেতো, ভালো কলেজে চান্স পাও, সবার থেকে এগিয়ে থাকো।“সাফল্য যেন আমাদের সব কথার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে।
কিন্তু জীবন সব সময় “হ্যাঁ” বলে না।
জীবনে এমন অনেক পরীক্ষা আসে যেখানে আমরা সফল হতে পারি না। অনেক ইন্টারভিউয়ে সুযোগ পাই না। অনেক স্বপ্ন পূরণ হতে সময় লাগে। অনেক দরজা আমাদের সামনে বন্ধ হয়ে যায়।
সমস্যাটা 'না' শোনায় নয়। সমস্যা হলো, বড় হওয়ার সময় অনেকে এত কম 'না' শোনে যে, 'না' শুনলে কী করতে হয় তারা জানেই না। প্রথম প্রত্যাখ্যানেই তারা আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলে। একবার ব্যর্থ হলে তারা ঘুরে দাঁড়াতে পারে না। বোঝে না যে একটা 'না' দিয়ে তার দাম ঠিক হয় না।
কিন্তু শক্ত মনের মানুষ এভাবে তৈরি হয় না। যখন আমরা বুঝতে শিখি যে একটি “না” যাত্রার শেষ নয়, বরং যাত্রারই একটি অংশ—তখনই আমরা শক্তিশালী হয়ে উঠি।
প্রতিটি সফল উদ্যোক্তা, খেলোয়াড়, শিল্পী, বিজ্ঞানী কিংবা নেতা জীবনে অসংখ্য “না” শুনেছেন, তারপর একদিন একটি বড় “হ্যাঁ” পেয়েছেন। তাদের সঙ্গে অন্যদের তফাত এটাই যে, 'না' শুনে তারা থেমে যাননি।
ওই ছোট্ট ছেলেটি শুধু স্ন্যাকস বিক্রি করছিল না। সে “না” সংগ্রহ করছিল। সে সাহসের অনুশীলন করছিল। সে শক্ত হতে শিখছিল। সে জীবনের জন্য তৈরি হচ্ছিল। মাত্র পাঁচ বছর বয়সেই সে এমন একটি সত্য বুঝে গিয়েছিল, যা অনেক মানুষ সারাজীবনেও শিখতে পারেন না—
প্রতিটি “না” পূর্ণচ্ছেদ নয়। অনেক সময় সেটা শুধু একটি কমা—পরের সুযোগের আগে সামান্য বিরতি মাত্র।
তাই এমন সন্তান গড়ে তুলবেন না, যে শুধু সাফল্যের জন্য প্রস্তুত। এমন সন্তান গড়ে তুলুন, যে ব্যর্থতাকে ভয় পায় না। আর পরের বার কোন শিশু ব্যর্থ হলে তাকে শুধু জিজ্ঞেস করবেন না, “তুমি জিতেছ?”
বরং জিজ্ঞেস করুন, “তুমি আবার চেষ্টা করেছ তো?”
সেই শিক্ষককে স্যালুট। সেই বাবা-মাকে স্যালুট। আর সেই ছোট্ট ছেলেটিকেও স্যালুট, যে বড়দের পৃথিবীকে একটি বড় শিক্ষা দিয়ে গেল—একটা সুন্দর 'হ্যাঁ' এর রাস্তা তৈরি হয় একশোটা 'না' দিয়ে।

No comments