তুলসীদাস ও রহিমের বিনয়ের শিক্ষা: আশিস কুমার পণ্ডা
মুঘল সম্রাট আকবর মহান-এর শাসনকালে গোস্বামী তুলসীদাস এবং আব্দুল রহীম খান-ই-খানা তাঁদের যুগের দুইজন সর্বাধিক বিশিষ্ট কবি ও পণ্ডিত হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। ধর্ম, সংস্কৃতি ও জীবনয…
তুলসীদাস ও রহিমের বিনয়ের শিক্ষা: আশিস কুমার পণ্ডা
মুঘল সম্রাট আকবর মহান-এর শাসনকালে গোস্বামী তুলসীদাস এবং আব্দুল রহীম খান-ই-খানা তাঁদের যুগের দুইজন সর্বাধিক বিশিষ্ট কবি ও পণ্ডিত হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। ধর্ম, সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রায় ভিন্নতা থাকলেও তাঁদের মধ্যে ছিল গভীর শ্রদ্ধা, সৌহার্দ্য ও আন্তরিক সম্পর্ক।
একদিন এক অসহায় মহিলা গোস্বামী তুলসীদাস -এর কাছে এসে কাঁদতে কাঁদতে বললেন, “গুরুজি, আমার মেয়ের বিয়ে। কিন্তু আমার কাছে কোনও অর্থ নেই। আপনি যদি একটু সাহায্য করতেন!”
তুলসীদাসজি শান্ত ও বিনয়ী কণ্ঠে বললেন, “মা, আমি তো সাধারণ ব্রাহ্মণ মানুষ। কুটিরে থাকি। আমার নিজের কাছেই তেমন কিছু নেই যে তোমাকে অর্থ সাহায্য করতে পারি।”
মহিলা তখন বললেন, “আমি জানি আপনার কাছে ধনসম্পদ নেই। কিন্তু আপনি যদি একটি সুপারিশপত্র লিখে দেন, তাহলে রহীম সাহেব নিশ্চয়ই সাহায্য করবেন।”
আব্দুল রহীম খান-ই-খানা শুধু একজন মহান কবিই ছিলেন না, তিনি সম্রাট আকবর-এর দরবারের একজন সম্মানিত মন্ত্রী ও সুবেদারও ছিলেন। তুলসীদাসজি তাঁকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করতেন। তাই তিনি রহিমের নামে একটি সুপারিশপত্র লিখে দিলেন।
মহিলা সেই চিঠি নিয়ে রহিমের কাছে গেলেন। রহীম চিঠিটি পড়ে এক মুহূর্তও দেরি না করে তাঁকে প্রয়োজনীয় অর্থ সাহায্য করলেন।
কয়েকদিন পরে মহিলা আবার তুলসীদাসজির কাছে এসে কৃতজ্ঞতাভরে বললেন, “আপনার দয়ায় আমার মেয়ের বিয়ে ভালোভাবে হয়ে গেল।”
তুলসীদাসজি তখন জিজ্ঞাসা করলেন, “ভালো কথা, রহীমজি তোমাকে সাহায্য করেছেন। কিন্তু তাঁর আচরণ কেমন ছিল?”
মহিলা বললেন, “তিনি যখন আমাকে দান করছিলেন, তখন তাঁর হাত ছিল উপরে, কিন্তু চোখ ছিল নিচু।”
এ কথা শুনে তুলসীদাসজি রহীমকে লিখলেন—
“ऐसी देनी देन ज्यूँ, कित सीखे हो सैंन।
ज्यों-ज्यों कर ऊँच्यो करो, त्यों-त्यों नीचे नैन॥“
অর্থাৎ—
“এমন দানের ভঙ্গি কোথায় শিখলে?
যতই হাত উপরে ওঠে, ততই চোখ নিচু হয়ে যায়!”
এর উত্তরে রহীম অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে লিখলেন—
“देनहार कोई और है, भेजत है दिन रैन।
लोग भरम हम पर करें, ताते नीचे नैन॥“
অর্থাৎ—
“দাতা তো অন্য কেউ (ঈশ্বর),
তিনিই দিনরাত পাঠিয়ে চলেছেন।
মানুষ ভুল করে আমাকে দাতা ভাবে,
তাই আমার চোখ (লজ্জায়) নিচু হয়ে যায়।”
শিক্ষা: —
এই গল্প আমাদের এক গভীর মানবিক শিক্ষা দেয়।
সত্যিকারের মহান মানুষ কখনও অহংকার করেন না। তাঁরা জানেন, মানুষের যা কিছু আছে—ক্ষমতা, সম্পদ, প্রতিভা, সম্মান—সবই ঈশ্বরের দান। তাই দান বা সাহায্য করার সময় বিনয়ী থাকা মানুষের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গুণ।
দান তখনই মহৎ হয়ে ওঠে, যখন তার সঙ্গে নম্রতা, সম্মান এবং মানবিকতা যুক্ত থাকে। কারণ দানের মধ্যে যেমন আনন্দ আছে, তেমনি সেখানে অহংকার জন্ম নেওয়ার সম্ভাবনাও থাকে। তাই মনে রাখা উচিত—ঈশ্বর আমাদের দান করার সামর্থ্য দিয়েছেন, এটি কৃতজ্ঞতার বিষয়; গর্ব করার বিষয় নয়।
যিনি সাহায্য গ্রহণ করছেন, তিনি আসলে দাতাকে মানবতার সেবা করার সুযোগ দিচ্ছেন। তাই গ্রহীতাকেও যথেষ্ট সম্মান ও কৃতজ্ঞতা জানানো উচিত।
তেমনি, খ্যাতি বা প্রশংসা পাওয়ার উদ্দেশ্যে দান করা উচিত নয়। নিঃশব্দ, প্রচারবিহীন এবং আন্তরিক দান দাতাকে অহংকার থেকে রক্ষা করে, আবার গ্রহীতার আত্মসম্মানও অক্ষুণ্ণ রাখে। দানের মর্যাদা তখনই রক্ষা পায়, যখন—“ডান হাত কী দান করল, তা বাম হাতও জানতে না পারে।”
অনেক মানুষ দান করেন, সেবা করে আনন্দ পান। আসলে এই আনন্দ শুধু গ্রহীতার নয়, দাতারও। কারণ এই প্রক্রিয়ায় মানুষ শুধু অন্যকে সাহায্য করেন না, নিজের মনকেও পরিশুদ্ধ করেন এবং নিজের জীবনকেও আরও সুন্দর ও অর্থপূর্ণ করে তোলেন।

No comments