Page Nav

HIDE

Grid Style

GRID_STYLE

Post/Page

Weather Location

Breaking News:

latest

বহুকাজের বিভ্রম—আশিস কুমার পণ্ডা

বহুকাজের বিভ্রম—আশিস কুমার পণ্ডা
ভাবুন, একজন মানুষ নিজের বাড়ির ভেতরে দাঁড়িয়ে আছেন।এক হাতে একটি ল্যাপটপ। সেখানে জমে আছে কিছু অসমাপ্ত ই-মেইল আর অর্ধেক লেখা পরিকল্পনা। অন্য হাতে এক কাপ কফি, যা ধীরে ধীরে ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। আর ঠোঁট…

 




বহুকাজের বিভ্রম—আশিস কুমার পণ্ডা


ভাবুন, একজন মানুষ নিজের বাড়ির ভেতরে দাঁড়িয়ে আছেন।

এক হাতে একটি ল্যাপটপ। সেখানে জমে আছে কিছু অসমাপ্ত ই-মেইল আর অর্ধেক লেখা পরিকল্পনা। অন্য হাতে এক কাপ কফি, যা ধীরে ধীরে ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। আর ঠোঁটের ফাঁকে গোঁজা আছে একটি কলম, যেন কাগজে নামার অপেক্ষায় থাকা কিছু চিন্তা।

তিনি টাইপ করতে পারছেন না, কারণ এক হাত কফির কাপে ব্যস্ত। কফিতে চুমুকও দিতে পারছেন না, কারণ অন্য হাতে ল্যাপটপ। আবার কলম দিয়ে লিখতেও পারছেন না, কারণ দুই হাতই আগেই দখল হয়ে গেছে।

প্রথম দেখায় তাঁকে খুব ব্যস্ত মনে হয়। মনে হয় তিনি অনেক কাজ সামলাচ্ছেন। কিন্তু বাস্তবে তিনি নিজের তৈরি জটিলতায় আটকে গেছেন। তাঁর হাতে থাকা প্রতিটি জিনিস অন্যটির কাজে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কাজের জন্য প্রয়োজনীয় সব উপকরণ তাঁর কাছে আছে, কিন্তু কোনো কাজই এগোচ্ছে না।

এ যেন আধুনিক জীবনেরই এক প্রতিচ্ছবি—যেখানে ব্যস্ততাকে সাফল্য মনে করা হয়, আর সারাক্ষণ কিছু না কিছু করে যাওয়াকেই উৎপাদনশীলতা বলে ধরে নেওয়া হয়।

এই দৃশ্য মোটেও বিরল নয়। বরং আমাদের অনেকের প্রতিদিনের জীবনের গল্প।

আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যেখানে অনেক কাজ একসঙ্গে করাকে খুবই গুরুত্ব দেওয়া হয়। মিটিং করতে করতে মোবাইলে মেসেজের উত্তর দেওয়া, পড়াশোনার ফাঁকে সোশ্যাল মিডিয়া দেখা, একসঙ্গে অনেক প্রকল্প সামলানো বা একাধিক দক্ষতা শেখার চেষ্টা—এসবকে আমরা প্রায়ই কর্মদক্ষতার লক্ষণ বলে মনে করি।

আমাদের ধারণা, যত বেশি কাজ একসঙ্গে করতে পারব, তত বেশি সফল হব।

কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন কথা বলে।

আধুনিক স্নায়ুবিজ্ঞান দেখিয়েছে, মানুষের মস্তিষ্ক আসলে অনেক কাজ একসঙ্গে করার জন্য তৈরি নয়। আমরা যখন মনে করি একসঙ্গে অনেক কাজ করছি, তখন আসলে আমাদের মস্তিষ্ক খুব দ্রুত এক কাজ থেকে আরেক কাজে সরে যাচ্ছে।

প্রতিবার এই পরিবর্তনের জন্য মানসিক শক্তি খরচ হয়। প্রতিটি বাধা মনোযোগ ভেঙে দেয়। এর ফলে ভুল বাড়ে, সৃজনশীলতা কমে, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দুর্বল হয় এবং আমরা দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়ি।

এখানেই অনেক কাজ একসঙ্গে করার বিভ্রম।

আমরা যত বেশি একসঙ্গে অনেক কাজ করার চেষ্টা করি, অনেক সময় তত কম কাজ সম্পন্ন করতে পারি।

তবুও চারপাশের পৃথিবী আমাদের সেই দিকেই ঠেলে দেয়। নোটিফিকেশন একের পর এক আসে। তথ্যের স্রোত কখনও থামে না। প্রতিদিন নতুন নতুন সুযোগ সামনে আসে। ফলে কোন কাজটি সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ, তা বেছে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। ফলাফল হলো, আমরা এক অসমাপ্ত কাজ থেকে আরেক অসমাপ্ত কাজে ছুটে বেড়াই। সারাদিন ব্যস্ত থাকি, কিন্তু দিনের শেষে দেখি তেমন কিছুই এগোয়নি।

তাই আসল চ্যালেঞ্জ আরও ভালোভাবে অনেক কাজ একসঙ্গে করা নয়। আসল চ্যালেঞ্জ হলো আরও গভীরভাবে মনোযোগ দিতে শেখা।

সাফল্য সাধারণত একটি সহজ সিদ্ধান্ত থেকেই শুরু হয়—কোন কাজটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, তা ঠিক করা এবং তাকে সম্পূর্ণ মনোযোগ দেওয়া।

এর অর্থ এই নয় যে অন্য সব দায়িত্ব ভুলে যেতে হবে। বরং বুঝতে হবে, সব কাজ সমান গুরুত্বপূর্ণ নয়। কিছু কাজ জরুরি, কিছু কাজ গুরুত্বপূর্ণ। কিছু সুযোগ সত্যিই মূল্যবান, আবার কিছু সুযোগ কেবল আকর্ষণীয় বিভ্রান্তি।

এই পার্থক্য বুঝতে পারা আজকের সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা।

আপনি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, কর্মজীবন গড়ছেন, নতুন কোনো দক্ষতা শিখছেন, বই লিখছেন, ব্যবসা গড়ছেন কিংবা কোনো সম্পর্ককে আরও সুন্দর করে তুলছেন—যে ক্ষেত্রই হোক, অর্থপূর্ণ অগ্রগতির জন্য প্রয়োজন একাগ্রতা।

আপনার মনোযোগের মানই অনেকাংশে আপনার ফলাফলের মান নির্ধারণ করে।

একসঙ্গে অনেকগুলো কাজ হয়তো আপনাকে ব্যস্ত রাখবে, কিন্তু সামনে এগিয়ে নিয়ে যাবে মনোযোগ।

তাই একটি কাজকে বেছে নিন। অপ্রয়োজনীয় বিভ্রান্তিগুলো সরিয়ে রাখুন। যে কাজটি আজ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, তাকে আপনার সর্বোচ্চ মনোযোগ দিন।

কারণ শেষ পর্যন্ত আপনি একসঙ্গে কতগুলো কাজ হাতে নিয়েছিলেন-তা দিয়ে আপনার দক্ষতা মাপা হবে না, মাপা হবে আপনি কোন কাজটি শেষ পর্যন্ত সম্পূর্ণ করেছিলেন-তা দিয়ে।

তাই, এক সময়ে একটি কাজেই পুরোপুরি উপস্থিত থাকুন। দেখবেন, শুধু কাজেই নয়, জীবনেও অনেক বেশি সাফল্য ও তৃপ্তি খুঁজে পাবেন।

No comments