একটি চালুনি, একটু জল, আর মনের নবীকরণের এক পাঠ— আশিস কুমার পন্ডা
মাঝে মাঝে আমাদের মনে হঠাৎ করে অনুপ্রেরণার ঢেউ আসে—কোন অনুপ্রেরণামূলক ভাষণ আমাদের নাড়া দেয়, কোন ভিডিও আমাদের শক্তিতে ভরিয়ে তোলে, কোন বই হৃদয়কে আলোয় ভরে দেয়। আমর…
একটি চালুনি, একটু জল, আর মনের নবীকরণের এক পাঠ
— আশিস কুমার পন্ডা
মাঝে মাঝে আমাদের মনে হঠাৎ করে অনুপ্রেরণার ঢেউ আসে—কোন অনুপ্রেরণামূলক ভাষণ আমাদের নাড়া দেয়, কোন ভিডিও আমাদের শক্তিতে ভরিয়ে তোলে, কোন বই হৃদয়কে আলোয় ভরে দেয়। আমরা তখন খুব উচ্ছ্বসিত হই। কিন্তু কয়েক দিন বা কয়েক মাস পর সেই উত্তেজনা ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে যায়। যে শব্দগুলো একসময় আমাদের ছুঁয়ে গিয়েছিল, সেগুলো আমরা ভুলে যাই। যে ভাবনাগুলো আমাদের অনুপ্রাণিত করেছিল, সেগুলোও আর মনে থাকে না। স্বাভাবিকভাবেই আমরা হতাশ হই এবং মনে প্রশ্ন জাগে—“যদি পরে সব ভুলেই যাই, তবে বই পড়া বা অনুপ্রেরণামূলক কিছু শোনা বা দেখার মানে কী?” এই প্রশ্নটা নিঃসন্দেহে অনেকের মনে জাগে।
অনেক আগে, একদিন এক তরুণ শিষ্য ঠিক এই একই প্রশ্ন নিয়ে তাঁর গুরুদেবের কাছে এল। সে বলল, “গুরুদেব, আমি এত বই পড়ি, আপনার বক্তৃতা শুনি—কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বেশিরভাগই ভুলে যাই। তাহলে পড়া বা বক্তৃতা শোনার উপকারটাই বা কী?
গুরুদেব সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিলেন না। তিনি শুধু মুচকি হাসলেন। কয়েক দিন পরে তিনি শিষ্যকে নদীর ধারে নিয়ে গেলেন এবং তার হাতে একটি ধুলো ভরা, কালচে চালুনি (ছিদ্রভরা একটি বাসন) তুলে দিলেন। নরম স্বরে বললেন, “নদী থেকে একটু জল নিয়ে এসো।”
শিষ্য অবাক হয়ে গেল—চালুনিতে জল ধরে রাখা কি সম্ভব? অসম্ভব! তবু সে তর্ক করল না। সে তার গুরুকে বিশ্বাস করল। সে দৌড়ে নদীতে গেল, চালুনি ডুবিয়ে দৌড়ে ফিরল—খালি। আবার চেষ্টা করল—পাঁচবার, দশবার। কখনো দ্রুত দৌড়াল, কখনো নিচু হয়ে জল তুলল, কখনো আঙুল দিয়ে চালুনির ছিদ্র বন্ধ করার চেষ্টা করল। কিন্তু যাই করুক না কেন, চালুনি প্রতিবারই খালি হয়ে ফিরে এল। শেষ পর্যন্ত ক্লান্ত আর হতাশ হয়ে সে চালুনিটি গুরুর সামনে রেখে দিয়ে বলল, “গুরুদেব, আমাকে ক্ষমা করুন। আমি ব্যর্থ হয়েছি। এই কাজ অসম্ভব।”
গুরুদেব স্নেহভরে তার দিকে তাকিয়ে বললেন, “তুমি ব্যর্থ হওনি, বৎস। চালুনিটাকে ভালো করে দেখো।” শিষ্য চালুনির দিকে তাকাল। তার চোখে বিস্ময়ের ছাপ ফুটে উঠল। যে চালুনিটি আগে ধুলো, ময়লা লেগে কালো হয়ে গিয়েছিল, সেটি এখন ঝকঝকে—পরিষ্কার, উজ্জ্বল, প্রায় নতুনের মতো।
গুরুদেব শিষ্যকে বুঝিয়ে বললেন, “বই পড়া বা বক্তৃতা শোনা ঠিক এমনই। সব কিছু যদি মনে নাও থাকে, জ্ঞান যদি এই চালুনির মতো মন থেকে জলের মতো গলে যায়—তবুও মন ধীরে ধীরে পরিষ্কার, স্বচ্ছ আর উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। বুঝতে না পারলেও, তুমি ভেতরে ভেতরে বদলে যেতে থাক।”
আজকের দ্রুতগতির জীবনে আমাদের মন সব সময় তথ্য, দায়িত্ব আর বাইরের চাপের আঘাতে ভরপুর হয়ে থাকে। এর ফলে মনে ধুলো জমে—দুশ্চিন্তা, চাপ, অনিশ্চয়তা, বিভ্রান্তি, হতাশা আর নেতিবাচক ভাবনা। যেমন খোলা জায়গায় রাখা জিনিসে ধুলো জমে, তেমনই ধীরে ধীরে নেতিবাচকতা মনে জমে। তাই মন পরিষ্কার করা খুবই দরকার—আর তার উপকার অনেক দূর পর্যন্ত পৌঁছে যায়।
প্রতিবার আমরা যখন কিছু অনুপ্রেরণামূলক গ্রহণ করি, তখন আমাদের অন্তর একটু করে সতেজ হয়। আমরা যেমন প্রতিটি জলকণা মনে রাখি না, তবু জল পান করেই বেঁচে থাকি—তেমনি অনুপ্রেরণার প্রতিটি শব্দ মনে রাখার দরকার নেই। এর আসল উদ্দেশ্য হলো—মনের অপ্রয়োজনীয় শব্দ কমানো, স্পষ্টতা বাড়ানো, মনোযোগ ধারালো করা এবং ভেতর থেকে শক্তিশালী করা।
ঘর পরিষ্কার করা বা দাঁত ব্রাশ করার মতোই, মনের নবীকরণও নিয়মিত হলে, দীর্ঘমেয়াদে ভালো ফল পাওয়া যায়। তাই প্রতিদিন অল্প অল্প করে মন পরিষ্কার করতে থাক—ভালো কথা পড়, অনুপ্রেরণামূলক কণ্ঠ শোনো, অর্থপূর্ণ কিছু শেখ, ইতিবাচক জিনিস দেখ। প্রতিটি অনুপ্রেরণার প্রবাহ আমাদের ধীরে ধীরে, নিঃশব্দে আরও পরিষ্কার, আরও উজ্জ্বল করে তুলবে—আর আমাদের সেই মানুষটির আরও কাছে নিয়ে যাবে, যিনি হওয়ার জন্য আমরা জন্মেছি।

No comments