মুদ্রার তৃতীয় দিক — আশিস কুমার পণ্ডাআমরা জানি, একটি মুদ্রার দুটি দিক থাকে। কিন্তু একটু ভালো করে দেখলে বোঝা যায়, একটি মুদ্রার আসলে তিনটি দিক আছে—একটি হেড, একটি টেল, আর একটি কিনারা বা ধার।জীবনের প্রতিটি মতবিরোধ, ভুল বোঝাবুঝি এবং স…
আমরা জানি, একটি মুদ্রার দুটি দিক থাকে। কিন্তু একটু ভালো করে দেখলে বোঝা যায়, একটি মুদ্রার আসলে তিনটি দিক আছে—একটি হেড, একটি টেল, আর একটি কিনারা বা ধার।
জীবনের প্রতিটি মতবিরোধ, ভুল বোঝাবুঝি এবং সংঘাতের ক্ষেত্রেও বিষয়টি ঠিক একই রকম।
এখানেও তিনটি দিক থাকে —আমার দিক, আপনার দিক, আর সত্যি দিক।
সমস্যা হলো, আমরা বেশিরভাগ সময় নিজের দিকটাকেই সঠিক প্রমাণ করতে ব্যস্ত থাকি। অন্যের দিকটি বোঝার চেষ্টা করি না। আর সত্যকে খুঁজে দেখার জন্য তো আরও কম সময় দিই।
ধরুন, দুই বন্ধুর ঝগড়া হলো, কথা বন্ধ।
একজন বলছেন, "ও আমাকে অপমান করেছে।"
অন্যজন বলছেন, "ও আমাকে কখনই বোঝার চেষ্টাই করেনি।"
দুজনেই হয়তো নিজের জায়গায় ঠিক। দুজনেরই কষ্ট পাওয়ার কারণ আছে। কিন্তু আসল সত্যিটা পুরোপুরি কারো একার দিকে নেই। সত্যিটা আছে মাঝামাঝি কোথাও।
এমন ঘটনা শুধু বন্ধুদের মধ্যে নয়, কর্মক্ষেত্রে, পরিবারে, এমনকি প্রতিদিনের সাধারণ সম্পর্কেও ঘটে।
যে সহকর্মীকে আপনার রূঢ় মনে হচ্ছে, তিনি হয়তো এমন কোন সমস্যার মধ্যে আছেন যার কথা কাউকে বলেনি।
যে বন্ধু অনেক দিন যোগাযোগ করছেন না, তিনি হয়তো এমন কোন সমস্যায় আছেন যা আপনি জানেন না।
যে মানুষটি আপনার সমালোচনা করছেন, তিনি হয়তো আপনাকে আঘাত দিতে চান না, নিজের ভয় বা রাগ থেকেই কথাগুলো বলছেন।
পরিণত মানুষের একটি বড় লক্ষণ হলো এটা বোঝা —
শুধু নিজের দিক দেখলে আমরা প্রতিক্রিয়া দেখাই।
অন্যের দিক দেখার চেষ্টা করলে আমরা বুঝতে শিখি।
আর সত্য খুঁজতে গেলে আমরা উন্নত হই।
অনেক ঝগড়া এই জন্য চলতেই থাকে, কারণ তারা খারাপ মানুষ বলে নয়। বরং প্রত্যেকে পুরো ছবির বদলে তার একটি ছোট অংশ দেখে সেটাকেই সম্পূর্ণ সত্যি বলে মনে করেন।
তাই কোনো পরিস্থিতি বিচার করার আগে নিজেকে কয়েকটি প্রশ্ন করুন—
আমি কী দেখতে পাচ্ছি না?
অন্য মানুষটির চোখে বিষয়টা কেমন দেখাচ্ছে?
আমার মতের বাইরেও কি কোনো বড় সত্যি আছে?
এই প্রশ্নগুলোই ঝগড়াকে আলোচনায় বদলে দেয়, বিচারকে বোঝাপড়ায় বদলে দেয়, আর সমস্যাকে বড় হওয়ার সুযোগে বদলে দেয়।
তাই কোন কিছু বিচার করার আগে মুদ্রার কথা মনে করুন। তৃতীয় দিকটা খুঁজুন — সত্যিটা।
কারণ জ্ঞান তখনই শুরু হয়, যখন আমরা "কে ঠিক?" না ভেবে "কোনটা সত্যি?" ভাবতে শুরু করি।
আর বেশিরভাগ সময় সত্যিটা দুই প্রান্তে থাকে না। সত্যিটা থাকে মাঝখানের সেই সরু জায়গায়, যেখানে বোঝাপড়া, সহানুভূতি আর বিনয় একসাথে থাকে। জীবন সবসময় "হয় এটা, নয় ওটা" নয়। বেশিরভাগ সময় জীবন হলো "এটাও, ওটাও।"
তাই পরের বার যখন কারো সাথে মতের অমিল হবে বা কাউকে তাড়াতাড়ি বিচার করে ফেলবেন, একটু থামুন। হয়তো এমন একটা দিক আছে যা আপনি এখনো ভাবেননি।
সেই তৃতীয় দিকটা খুঁজুন। আপনি শুধু সঠিক হবেন না, আপনি জ্ঞানী হয়ে উঠবেন।

No comments