Page Nav

HIDE

Grid Style

GRID_STYLE

Post/Page

Weather Location

Breaking News:

latest

আমুল: এক চিরসবুজ পরিচিতি — আশিস কুমার পন্ডা

আমুল: এক চিরসবুজ পরিচিতি — আশিস কুমার পন্ডা
ভাবুন তো—এক ছোট্ট ফুটফুটে মেয়ে, গোলগাল মুখ, বড় বড় চোখ, পোলকা-ডট ফ্রক পরে—রাস্তার ধারের হোর্ডিং থেকে আপনাকে দেখছে। সে হাসছে। কখনও খোঁচা দিচ্ছে, কখনও মজা করছে, কখনও আবার এমন কিছু বলছে—যা আ…

 



আমুল: এক চিরসবুজ পরিচিতি — আশিস কুমার পন্ডা


ভাবুন তো—

এক ছোট্ট ফুটফুটে মেয়ে, গোলগাল মুখ, বড় বড় চোখ, পোলকা-ডট ফ্রক পরে—রাস্তার ধারের হোর্ডিং থেকে আপনাকে দেখছে। সে হাসছে। কখনও খোঁচা দিচ্ছে, কখনও মজা করছে, কখনও আবার এমন কিছু বলছে—যা আপনাকে ভাবতে বাধ্য করছে।

সে শুধু একটা বিজ্ঞাপনের চরিত্র নয়। সে একটা সময়। একটা অনুভূতি।

সে—আমুল গার্ল।

আজকের দুনিয়ায় ব্র্যান্ড মানেই বদল—আজ নতুন লোগো, কাল নতুন ট্যাগলাইন, পরশু নতুন মুখ। প্রাসঙ্গিক থাকার জন্য সবাই দৌড়াচ্ছে। কিন্তু এই দৌড়ের বাইরে, এক ব্র্যান্ড দাঁড়িয়ে আছে স্থির হয়ে—চুপচাপ, আত্মবিশ্বাসী। সেই ব্র্যান্ডটা হলো—আমুল, গুজরাটের আনন্দে অবস্থিত ভারতের বৃহত্তম দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায় সংস্থা। পুরো নাম আনন্দ মিল্ক ইউনিয়ন লিমিটেড (Anand Milk Union Limited), ভারতের শ্বেত বিপ্লব বা দুগ্ধ বিপ্লবের অগ্রদূত।

প্রায় ছয় দশক ধরে আমুল একই ম্যাসকট ধরে রেখেছে—ওই গোলগাল, মিষ্টি, বড় চোখের পোলকা-ডট ফ্রক পরা ছোট্ট মেয়েটা। যেখানে সবাই বদলাতে ব্যস্ত, সেখানে আমুল দেখিয়েছে—একই থাকা-ই কখনো কখনো সবচেয়ে বড় শক্তি।

শুরুটা ছিল এক লড়াই: —

৬০-এর দশকে, যখন পলসন বাটার বাজারে রাজত্ব করছে, আমুল তখন প্রায় অচেনা। আমুলের দরকার ছিল চোখে পড়ার মতো আলাদা কিছু।

অ্যাডভার্টাইজিং ম্যান সিলভেস্টার দা-কুনহার মাথা থেকে বেরোল সেই ভাবনা—একটা ম্যাসকট। আর্টিস্ট ইউস্টেস ফার্নান্ডেজ সেটাকে রূপ দিলেন—একটা গোল মুখ, বড় চোখ, পোলকা-ডট ফ্রক পরা ছোট্ট মেয়ে। না, সে কোন পর্দার নায়িকা নয়, তার মধ্যে কোন বাড়াবাড়ি গ্ল্যামার নেই। সে সহজ। সে চেনা। সে আপনার আমার বাড়ির ছোট্ট মেয়ে। খুব আপন। আর সেই কারণেই—সে ভোলার নয়।

এইভাবেই জন্ম নিল আমুল গার্ল।

তারপর এল সেই লাইন—“Utterly Butterly Delicious.” এই বিখ্যাত স্লোগানটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে, নিসা ডা’কুনহার (সিলভেস্টারের স্ত্রী) ভাবনা। এই স্লোগানটাই ইতিহাস হয়ে গেল। “Butterly” তো আসলে কোনো শব্দই না! কিন্তু ওই ছোট্ট ভুলটাই ম্যাজিক হয়ে গেল। মানুষ থামল, হাসল, মনে রাখল। যেটাকে কেতাবী ভাষায় বলে novelty factor— আমুল সেই নতুনত্বকেই নিজের সবচেয়ে বড় শক্তি বানিয়ে ফেলল।  

কেন বদলায়নি আমুলের ছোট্ট মেয়েটি?

প্রশ্নটা সহজ—“এত বছর ধরে একই ম্যাসকট? কেন?”

উত্তরটা আরও গভীর—কারণ, কিছু জিনিস বদলালে তার জাদু ভেঙে যায়। একটা শিশুর মুখ—কখনো পুরোনো হয় না। প্রজন্মের পর প্রজন্ম বড় হয়েছে তাকে দেখে। হঠাৎ বদলে দিলে—সেই সম্পর্কটাই হারিয়ে যেত।

কিন্তু আমুল একটা বুদ্ধি খেলল—মুখটা একই রাখল, কথা বদলাল। প্রতি সপ্তাহে, নতুন ঘটনা, নতুন খবর—আর সেই ছোট্ট মেয়েটা, নিজের ভাষায়, নিজের স্টাইলে—সবকিছু নিয়ে কথা বলে চললো।

রাজনীতি, ক্রিকেট, সিনেমা—সবকিছুর ওপর তার মন্তব্য। সে শুধু মাখন বিক্রি করেনি—দেশের গল্পও বলেছে।

বিজ্ঞাপনের থেকে বেশি কিছু:—

আমুলের বিজ্ঞাপন শুধু পণ্য নয়—একটা অনুভূতি।

“Give us this day our daily bread…”

“The Taste of India”

“Har Ghar Amul Ghar”

“Pitter-Patter, Pick-a, Pack-a Amul Butter”

এর মধ্যে আঞ্চলিক ছোঁয়াও ছিল। যেমন কলকাতার আন্দোলনের সময়—“Bread without Amul—cholbe na (চলবে না)!”

এইসব ছোট ছোট স্পর্শ আমুলকে মানুষের জীবনের অংশ করে তুলেছে।

আসল শিক্ষা:—

আজকের ব্র্যান্ডগুলো বদলাতে ব্যস্ত। আমুল শিখিয়েছে—একই থেকে গিয়ে কীভাবে জেতা যায়।

অনেকে চোখে পড়তে চায়। আমুল মনে থেকে গেছে।

অনেকে পণ্য বিক্রি করে। আমুল বিক্রি করে—একটু নস্টালজিয়া, একটু আপন ভাব, একটু হাসি।

শেষ দৃশ্য:—

আবার সেই ছোট্ট মেয়েটার দিকে তাকান। পোলকা-ডট ফ্রক, চোখে দুষ্টুমি, ঠোঁটে হাসি। সে আপনাকে কিছু বলছে। হয়তো মজা করে, হয়তো খোঁচা দিয়ে, হয়তো খুব সহজ একটা সত্যি মনে করিয়ে দিয়ে।

মনে রাখবেন—

সে শুধু মাখন বিক্রি করছে না। সে আপনাকে আপনার নিজের গল্প শোনাচ্ছে। সে আপনাকে আপনার সময়ের সাথে জুড়ে রাখছে। সে আপনাকে মনে করিয়ে দিচ্ছে— কিছু জিনিস বদলায় না, আর সেই না-বদলানো জিনিসগুলোই বছরের পর বছর ধরে টিকে থাকে।

No comments