আজ "পশ্চিমবঙ্গ দিবস"একটি মানুষের যেমন জন্মসনদ থাকে, তেমনি একটি ভূখণ্ডেরও থাকে ইতিহাস। কিন্তু ইতিহাসের সবচেয়ে বিস্ময়কর সত্য হলো-নাম বদলায়, মানচিত্র বদলায়, শাসক বদলায়, অথচ মাটির স্মৃতি বদলায় না।আজ আমরা যে ভূখণ্ডকে প…
আজ "পশ্চিমবঙ্গ দিবস"
একটি মানুষের যেমন জন্মসনদ থাকে, তেমনি একটি ভূখণ্ডেরও থাকে ইতিহাস। কিন্তু ইতিহাসের সবচেয়ে বিস্ময়কর সত্য হলো-নাম বদলায়, মানচিত্র বদলায়, শাসক বদলায়, অথচ মাটির স্মৃতি বদলায় না।
আজ আমরা যে ভূখণ্ডকে পশ্চিমবঙ্গ নামে জানি, হাজার বছর আগে তার এই নাম ছিল না। তখন এই মাটি পরিচিত ছিল গৌড়, রাঢ়, বরেন্দ্র, বঙ্গ, সমতট, তাম্রলিপ্ত, মল্লভূম, মানভূম ও কামতা নামে। প্রতিটি নাম ছিল শুধু একটি ভূখণ্ডের পরিচয় নয়, একটি সভ্যতার স্বাক্ষর, একটি যুগের আত্মপরিচয়।
আজকের মালদহ একসময় ছিল গৌড়। যে গৌড়ের রাজপথে রাজাদের অশ্ব ছুটেছে, যে গৌড় ছিল বাংলার রাজধানী, শিক্ষা ও বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র। বর্তমান মুর্শিদাবাদ অঞ্চলে ছিল কর্ণসুবর্ণ, যেখানে বসে রাজা শশাঙ্ক প্রথমবারের মতো বাঙালির রাজনৈতিক শক্তিকে একটি স্বতন্ত্র পরিচয় দিয়েছিলেন।
উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুরের বিস্তীর্ণ অঞ্চল ছিল বরেন্দ্রভূমি। জ্ঞানের আলো, কৃষির সমৃদ্ধি এবং বৌদ্ধ সংস্কৃতির এক অনন্য কেন্দ্র। বর্ধমান, বীরভূম, বাঁকুড়া ও পুরুলিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চল ছিল রাঢ়দেশ, এক কঠিন অথচ প্রাণশক্তিতে ভরপুর ভূমি, যেখানে শ্রম, সাহস এবং সংস্কৃতি একসঙ্গে বিকশিত হয়েছিল।
কলকাতা, নদিয়া ও ২৪ পরগনা ছিল বঙ্গ। পৃথিবী যখন সমুদ্রপথে একে অপরকে চিনতে শিখছিল, তখন বঙ্গের নৌবহর দূরদূরান্তে পাড়ি জমিয়েছিল। বাংলা নামের শিকড়ও লুকিয়ে আছে এই বঙ্গের বুকে।
আজকের পূর্ব মেদিনীপুর ছিল তাম্রলিপ্ত। এমন এক বন্দর, যেখানে দাঁড়িয়ে মানুষ শুধু পণ্য নয়, জ্ঞান, সংস্কৃতি এবং স্বপ্নও আদান-প্রদান করত। বাঁকুড়া ছিল মল্লভূম, যেখানে ইট ও মাটির গায়ে শিল্পীরা ইতিহাস লিখেছিলেন। পুরুলিয়া ছিল মানভূম, যার পাহাড়, অরণ্য ও লোকসংস্কৃতি আজও অতীতের কাহিনি শোনায়। উত্তরবঙ্গের বিস্তীর্ণ অঞ্চল ছিল কামতা রাজ্য, যার শক্তি ও ঐতিহ্য আজও কোচবিহারের রাজপ্রাসাদের ইটে ইটে কথা বলে।
উল্লেখ্য, প্রাচীনকালে আজকের ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে কোনো আন্তর্জাতিক সীমান্ত ছিল না। মালদহ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ ছিল প্রাচীন গৌড়, উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুরের সঙ্গে রাজশাহী বগুড়া ছিল বরেন্দ্রভূমি, কলকাতা, নদিয়া, ২৪ পরগনার পাশাপাশি ঢাকার বিস্তীর্ণ অঞ্চল ছিল বঙ্গ, আর কুমিল্লা, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম অঞ্চল ছিল সমতট ও হরিকেল। তখন এই সমগ্র অঞ্চল বৃহত্তর ভারতীয় সভ্যতার অংশ ছিল, আর বাংলার এই জনপদগুলি ছিল সেই সভ্যতার পূর্বদ্বার।
তারপর এলো নতুন শাসক, নতুন প্রশাসন, নতুন মানচিত্র। গৌড় হারাল রাজধানীর মর্যাদা, কর্ণসুবর্ণ হলো মুর্শিদাবাদ, কলিকাতা সুতানুটি গোবিন্দপুর মিলিয়ে জন্ম নিল কলকাতা। প্রাচীন জনপদগুলো ধীরে ধীরে রূপ নিল আধুনিক জেলায়।
কিন্তু ইতিহাসের গভীরতম শিক্ষা হলো-পরিচয় কেবল নামের মধ্যে থাকে না। পরিচয় থাকে মানুষের স্মৃতিতে, সংস্কৃতিতে, ভাষায়, লোকগানে, মন্দিরের পোড়ামাটিতে, নদীর স্রোতে এবং মাটির গন্ধে।
আজ পশ্চিমবঙ্গ দিবসে তাই শুধু একটি রাজ্যকে নয়, আমরা প্রণাম জানাই হাজার বছরের এক জীবন্ত সভ্যতাকে। আমরা স্মরণ করি গৌড়ের গৌরব, কর্ণসুবর্ণের আত্মবিশ্বাস, বরেন্দ্রের জ্ঞান, রাঢ়ের শক্তি, বঙ্গের সাহস, তাম্রলিপ্তের বিশ্বদৃষ্টি, মল্লভূমের শিল্প এবং কামতার ঐতিহ্যকে।
আসলে শিকড় যত গভীর হয়, ঝড়ের সামনে বৃক্ষ তত অটল থাকে, জাতির ক্ষেত্রেও সত্যটি একই।

No comments