শিল্পে ২০ হাজার কোটির ‘মাস্টারস্ট্রোক’! বাতিল আর্থিক সুবিধা ফেরাতে বাজেটে চমকের পথে শুভেন্দুর সরকার
রাজ্যে বিজেপি সরকার আসতেই এই বন্ধ দরজা খোলার ইঙ্গিত গোড়াতেই দিয়েছিলেন দলের রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। বেশ কয়েকটি বণিকসভার অনুষ্…
শিল্পে ২০ হাজার কোটির ‘মাস্টারস্ট্রোক’! বাতিল আর্থিক সুবিধা ফেরাতে বাজেটে চমকের পথে শুভেন্দুর সরকার
রাজ্যে বিজেপি সরকার আসতেই এই বন্ধ দরজা খোলার ইঙ্গিত গোড়াতেই দিয়েছিলেন দলের রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। বেশ কয়েকটি বণিকসভার অনুষ্ঠানে তিনি স্পষ্ট জানান, শিল্প লগ্নিকারীদের আস্থা ফেরাতে সরকার ইতিবাচক পদক্ষেপ করবে।
বাংলায় রাজনৈতিক পালাবদলের পর নবান্নের কুর্সিতে বসে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী রাজ্যের অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবনে একের পর এক বড় পদক্ষেপের ইঙ্গিত দিচ্ছেন। এবার রাজ্যের বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্পের চাকা ঘোরাতে এক মেগা পরিকল্পনার ব্লু-প্রিন্ট তৈরি করছে নতুন বিজেপি সরকার। প্রশাসন সূত্রের খবর, সমাজের প্রান্তিক অংশের উন্নয়নের দোহাই দিয়ে পূর্বতন তৃণমূল সরকার এক ঝটকায় যে ২০ হাজার কোটি টাকার শিল্প ভর্তুকি ও আর্থিক সুবিধা প্রকল্প বাতিল করে দিয়েছিল, তা নতুন আইনের মাধ্যমে ফের পুনরুজ্জীবিত করতে চলেছে নবান্ন।
আগামী সপ্তাহেই রাজ্যের নতুন সরকার তাদের প্রথম বাজেট (West Bengal Budget 2026) পেশ করতে চলেছে। সংশ্লিষ্ট মহলের জোর চর্চা— এই বাজেট অধিবেশনেই শিল্পকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষার ঐতিহাসিক পদক্ষেপ করতে পারেন মুখ্যমন্ত্রী তথা অর্থমন্ত্রী।
কী এই ২০ হাজার কোটির ধাক্কা? কেন ক্ষুব্ধ ছিল শিল্পমহল?
বিনিয়োগ টানতে এবং নতুন কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে দেশের যে কোনও রাজ্যেই শিল্পসংস্থাগুলিকে নানা ধরনের আর্থিক সুবিধা বা ছাড় দেওয়ার চল রয়েছে। বাংলায় এই রেওয়াজ শুরু হয়েছিল ১৯৯৩ সালে বামফ্রন্ট সরকারের শিল্প নীতির হাত ধরে। কারখানা গড়ার ক্ষেত্রে মূলধনী বিনিয়োগের শর্ত, যন্ত্রাংশ বসানো এবং রাজ্যের ভৌগোলিক এলাকার ওপর ভিত্তি করে ১০টি আর্থিক সুবিধা প্রকল্প চালু করা হয়েছিল। যার মধ্যে ছিল:
নির্দিষ্ট মূলধনী খাতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ভর্তুকি ও সুদের হারে বিশেষ ছাড়।
নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে আর্থিক উৎসাহ বা ভর্তুকি।
বিদ্যুৎ বিলের ডিউটি (Electricity Duty)-র ক্ষেত্রে বড়সড় ছাড়।
তৎকালীন ভ্যাট (VAT) বা যুক্তমূল্য করের ক্ষেত্রে বিশেষ ছাড় ও রিফান্ড।
তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় আসার পরেও তিন বার এই নীতি সংশোধন করে তা চালু রেখেছিল এবং সর্বশেষ সংশোধন হয়েছিল ২০২১ সালে। কিন্তু হঠাৎ করেই ২০২৫ সালের মার্চ মাসে এক অভূতপূর্ব আইন এনে ১৯৯৩ সাল থেকে চলে আসা সমস্ত আর্থিক সুবিধা এক ঝটকায় তুলে দেয় পূর্বতন সরকার। এপ্রিলে সেই সিদ্ধান্তের গেজেট প্রকাশিত হয়।
নবান্নের তৎকালীন যুক্তি ছিল— সমাজের প্রান্তিক মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও সামাজিক প্রকল্পগুলির (যেমন লক্ষ্মীর ভাণ্ডার ইত্যাদি) খরচ সামলাতে রাজ্যের কোষাগার খালি, তাই শিল্পের জন্য আর বাড়তি টাকা খরচ করা সম্ভব নয়। এর ফলে এক ধাক্কায় মাঝারি ও বড় বিনিয়োগকারীদের প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার আর্থিক সুবিধা বাতিল হয়ে যায়, যা নিয়ে লগ্নিকারীদের একাংশ ক্ষোভে ফেটে পড়েন এবং বেশ কয়েকটি সংস্থা আদালতেরও দ্বারস্থ হয়।
বণিকসভায় শমীকের ইঙ্গিত, আইনের ‘প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ’ রুখতে মরিয়া নবান্ন
রাজ্যে বিজেপি সরকার আসতেই এই বন্ধ দরজা খোলার ইঙ্গিত গোড়াতেই দিয়েছিলেন দলের রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। বেশ কয়েকটি বণিকসভার অনুষ্ঠানে তিনি স্পষ্ট জানান, শিল্প লগ্নিকারীদের আস্থা ফেরাতে সরকার ইতিবাচক পদক্ষেপ করবে।
প্রবীণ আমলা মহলের একাংশের দাবি, পূর্বতন সরকারের ওই সিদ্ধান্ত আসলে আইনের ভাষায় ‘প্রমিসরি এস্টোপেল’ বা আগাম প্রতিশ্রুতি দেওয়ার আইনি নীতি লঙ্ঘনের সামিল ছিল। কারণ, রাজ্য সরকারের দেওয়া ছাড়ের হিসেব কষেই শিল্পপতিরা কোটি কোটি টাকা এ রাজ্যে বিনিয়োগ করেছিলেন। মাঝপথে সেই সরকারি সুবিধা কেড়ে নেওয়া মানে রাজ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়া। আমলাদের একাংশের স্পষ্ট বক্তব্য— সামাজিক উন্নয়ন যেমন জরুরি, তেমনই শিল্পের প্রাপ্য সুবিধা কেড়ে নিলে রাজ্যের অর্থনৈতিক অগ্রগতি স্তব্ধ হয়ে যাবে, যা পরোক্ষভাবে রাজ্যবাসীর আর্থিক ভবিষ্যৎকেই অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেবে।
আগামী সপ্তাহেই বাজেট: কোন পথে হাঁটবে নতুন সরকার?
প্রশাসনিক সূত্রের খবর, শিল্পের এই আর্থিক সুবিধা প্রকল্প পুনরুজ্জীবনের সম্ভাবনা এখন একশো শতাংশ। তবে এর জন্য সরকারকে নতুন করে আইন প্রণয়ন করতে হবে।
এখন মূল কৌতূহল হল— আগামী সপ্তাহে পেশ হতে চলা নতুন সরকারের প্রথম বাজেটেই কি শুভেন্দু অধিকারী এই ২০ হাজার কোটির শিল্পাবর্তন নীতি ঘোষণা করবেন? নাকি রাজ্যসভার ৪টি আসন ও কেন্দ্রের দাপটকে কাজে লাগিয়ে দিল্লির কোনও বিশেষ প্যাকেজের মাধ্যমে এই ঘাটতি পূরণ করা হবে? শিল্পের এই প্রত্যাবর্তনের দিকেই এখন চাতক পাখির মতো তাকিয়ে রয়েছে গোটা বাংলা।

No comments