Page Nav

HIDE

Grid Style

GRID_STYLE

Post/Page

Weather Location

Breaking News:

latest

কফির কাপে ধাক্কা— আশিস কুমার পণ্ডা

কফির কাপে ধাক্কা— আশিস কুমার পণ্ডা
ধরো, বাইরে এক সুন্দর দিন। তুমি ঠিক করলে একটু হাঁটতে বের হবে। রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে কাছের একটি কফিশপে ঢুকে নিজের পছন্দের এক কাপ কফি কিনলে। হাতে গরম কফির কাপ নিয়ে তুমি কাউন্টার থেকে ঘুরে দাঁড়াতেই হ…

 




কফির কাপে ধাক্কা— আশিস কুমার পণ্ডা


ধরো, বাইরে এক সুন্দর দিন। তুমি ঠিক করলে একটু হাঁটতে বের হবে। রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে কাছের একটি কফিশপে ঢুকে নিজের পছন্দের এক কাপ কফি কিনলে। হাতে গরম কফির কাপ নিয়ে তুমি কাউন্টার থেকে ঘুরে দাঁড়াতেই হঠাৎ অসাবধানতাবশত একজনের সঙ্গে তোমার ধাক্কা লাগলো। মুহূর্তের মধ্যেই তোমার কফির প্রায় অর্ধেকটা মেঝেতে ছলকে পড়ে গেল।

এখন প্রশ্ন হলো — কাপ থেকে কফি কেন পড়ে গেল?

বেশিরভাগ মানুষ সঙ্গে সঙ্গেই বলবেন যে অন্য লোকটি ধাক্কা দিয়েছিল বলেই তোমার কাপ থেকে কফি পড়ে গেছে। আর অবশ্যই, কথাটি সত্যি।

আরেকটি ব্যাখ্যা হতে পারে যে তুমি তোমার চারপাশের দিকে পুরোপুরি খেয়াল করছিলে না। ঘুরে দাঁড়ানোর আগে যদি একবার পিছনের দিকে তাকাতে, তাহলে হয়তো ধাক্কাটা এড়ানো যেত এবং তোমার কফিও পড়তো না। এই উত্তরটাও সত্যি হতে পারে।

কিন্তু যদি আমরা ঘটনাটিকে একেবারে বাস্তব দৃষ্টিতে দেখি, তাহলে কফি পড়ে যাওয়ার আসল কারণ আরও সহজ হয়ে যায়।

তোমার কফি পড়ে গিয়েছিল কারণ তোমার কাপের ভেতরে কফি ছিল।

যদি কাপের মধ্যে গরম চা থাকত, তাহলে গরম চা পড়ত। যদি সেখানে লেবুর শরবত থাকত, তাহলে শরবত ছলকে বেরিয়ে আসত। অর্থাৎ, কাপের ভেতরে যা ছিল, ধাক্কা লাগার পরে সেটাই বাইরে বেরিয়ে এসেছে। আর সেটাই স্বাভাবিক।

জীবনও ঠিক এভাবেই কাজ করে।

জীবন মাঝে মাঝেই আমাদের নাড়িয়ে দেয়। কেউ আমাদের অপমান করেন, হতাশ করেন, বিশ্বাসঘাতকতা করেন, অথবা কষ্ট দেন। হঠাৎ করেই সমস্যা এসে দাঁড়ায়। পরিকল্পনা ভেঙে যায়। প্রত্যাশা পূরণ হয় না। আর সেই মুহূর্তগুলোতে আমাদের ভেতরে আগে থেকেই যা জমে ছিল, সেটাই বাইরে বেরিয়ে আসে।

যদি মনের মধ্যে রাগ জমে থাকে, তাহলে রাগই বেরিয়ে আসবে। যদি হৃদয়ে তিক্ততা থাকে, তাহলে তিক্ততাই ছড়িয়ে পড়বে। যদি হতাশা অনেকদিন ধরে ভেতরে নীরবে জমে থাকে, তাহলে সামান্য ধাক্কাতেই তা বিস্ফোরিত হতে পারে।

কিন্তু যদি একজন মানুষ নিজের ভেতর ধৈর্য, দয়া, কৃতজ্ঞতা এবং বোঝাপড়ার মনোভাব গড়ে তোলে, তাহলে কঠিন সময়েও সেই গুণগুলোই প্রকাশ পাবে।

সত্যিটা হলো — পরিস্থিতি আমাদের ভেতরের চরিত্র তৈরি করে না; বরং সেটাকে প্রকাশ করে।

যখন জীবন শান্ত থাকে, তখন ধৈর্যশীল, ভদ্র বা শান্ত দেখানো খুব সহজ। কিন্তু চাপের মুহূর্তই মানুষের আসল চরিত্র প্রকাশ করে। নাড়িয়ে দেওয়া মন বেশিক্ষণ নিজের প্রকৃত স্বভাব নিজের ভেতরে লুকিয়ে রাখতে পারে না।

এই কারণেই নিজের ভেতরের প্রস্তুতি এত গুরুত্বপূর্ণ।

প্রতিদিন আমরা ধীরে ধীরে আমাদের ভেতরের কাপটাকে কিছু না কিছু দিয়ে পূর্ণ করি — আমাদের চিন্তা দিয়ে, যাদের সঙ্গে আমরা সময় কাটাই তাদের মাধ্যমে, আমরা যে বই পড়ি তার মাধ্যমে, আমরা যে কথোপকথনে অংশ নিই তার মাধ্যমে, এবং আমরা যে অনুভূতিগুলো ভেতরে ধরে রাখি সেগুলোর মাধ্যমে।

যে মানুষ সবসময় নিজের মনকে নেতিবাচকতায় ভরিয়ে রাখে, সে ধীরে ধীরে মানসিকভাবে ভারী হয়ে পড়ে। অন্যদিকে, যে মানুষ সচেতনভাবে কৃতজ্ঞতা, ক্ষমা, সহানুভূতি এবং আত্মসচেতনতা চর্চা করে, সে ধীরে ধীরে মানসিক শক্তি, শান্তি এবং শেষ পর্যন্ত প্রকৃত সুখ অর্জন করে।

এই কারণেই আমাদের সচেতনভাবে ঠিক করতে হবে, আমরা আমাদের ভেতরে কী রাখতে চাই।

ক্ষমা করতে শেখো।

ছেড়ে দিতে শেখো।

ভালো চিন্তা বেছে নাও।

অনুপ্রেরণামূলক বই পড়ো।

যারা তোমার জীবনে শান্তি ও প্রজ্ঞা নিয়ে আসে, তাদের কাছাকাছি থাকো।

কৃতজ্ঞ হতে শেখো।

কারণ একদিন জীবন তোমাকেও নাড়িয়ে দেবে। আর যখন সেই মুহূর্ত আসবে, তখন পৃথিবী তোমার উদ্দেশ্য দেখবে না — তোমার ভেতর থেকে যা বেরিয়ে আসবে, সেটাই দেখবে।

শেষ কথা

জীবন কখনও পুরোপুরি মসৃণ থাকবে না। মানুষ তোমাকে হতাশ করবে। পরিস্থিতি বদলাবে। ব্যর্থতা, কষ্ট, সমালোচনা এবং অনিশ্চয়তা — এসব এড়ানো সম্ভব নয়।

কিন্তু মনে রেখো:

ধাক্কা তোমাকে সংজ্ঞায়িত করে না। ধাক্কার পরে তোমার ভেতর থেকে কী বেরিয়ে আসে, সেটাই তোমাকে প্রকাশ করে। তাই নিজের মন এবং হৃদয়কে এমনভাবে গড়ে তোলো, যাতে জীবন গভীরভাবে নাড়িয়ে দিলেও তোমার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে শান্তি, সাহস, দয়া এবং মানবিকতা।

No comments