তৃষ্ণার্ত কাক ও নুড়িপাথর—আশিস কুমার পণ্ডা
এক প্রচণ্ড গরমের দিনে একটি কাক তৃষ্ণায় প্রায় মরতে বসেছিল। সে একটি কলস খুঁজে পেল, যার একেবারে তলানিতে সামান্য জল ছিল—এতটাই নিচে যে তার ঠোঁট সেখানে পৌঁছাতে পারছিল না। সে চাইলে হাল ছেড়ে দ…
তৃষ্ণার্ত কাক ও নুড়িপাথর—আশিস কুমার পণ্ডা
এক প্রচণ্ড গরমের দিনে একটি কাক তৃষ্ণায় প্রায় মরতে বসেছিল। সে একটি কলস খুঁজে পেল, যার একেবারে তলানিতে সামান্য জল ছিল—এতটাই নিচে যে তার ঠোঁট সেখানে পৌঁছাতে পারছিল না। সে চাইলে হাল ছেড়ে দিতে পারত। কিন্তু তার বদলে সে একটি নুড়িপাথর তুলে কলসের মধ্যে ফেলল।
কিছুই ঘটল না। আরেকটি নুড়িপাথর। জলের স্তর সামান্য নড়ল।
আরেকটি। তারপর আরও একটি। তারপর আরও একটি।
প্রায় একশ নুড়িপাথর ফেলার পর অবশেষে জল তার ঠোঁটের কাছে পৌঁছাল। সে জল পান করল এবং বেঁচে গেল।
এবার একটু গভীরভাবে ভেবে দেখুন—
শুধু শেষ নুড়িপাথরটিই কি জলের স্তরকে কাকের ঠোঁটের কাছে পৌঁছে দিয়েছিল? নাকি তার আগে ফেলা প্রতিটি নুড়িপাথরেরই সমান অবদান ছিল?
আপনার জীবনও এই কলসের মতো।
আমরা সবাই “শেষ নুড়িপাথরের” গল্প ভালোবাসি—যেদিন আপনি পদোন্নতি পান, ব্যবসায় বড় সাফল্য অর্জন করেন, ম্যারাথন শেষ করেন, কিংবা কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য স্পর্শ করেন। কিন্তু বড় সাফল্য কোন একক পদক্ষেপের ফল নয়। এর পেছনে থাকে শত শত অদেখা নুড়িপাথর—ভোর ৫টার ব্যায়াম, গভীর রাত পর্যন্ত পড়াশোনা, প্রত্যাখ্যান থেকে শেখা শিক্ষা, অতিক্রম করা চ্যালেঞ্জ, আর আরামের চেয়ে শৃঙ্খলাকে বেছে নেওয়ার অসংখ্য মুহূর্ত।
এগুলোর প্রতিটিই এক একটি নুড়িপাথর।
আলাদাভাবে দেখলে এগুলো খুব ছোট মনে হতে পারে। কিন্তু একসঙ্গে মিলে এগুলো আপনার জীবনকে বদলে দিতে পারে।
দুঃখজনক বিষয় হলো, অনেক মানুষ দশম নুড়িপাথরের পরেই থেমে যায়, অথচ সাফল্য হয়তো তাদের জন্য অপেক্ষা করছিল শততম নুড়িপাথরের কাছে। তারা স্বপ্ন দেখা ছেড়ে দেয়, কারণ জলের স্তরে দৃশ্যমান কোন পরিবর্তন তারা দেখতে পায় না। তারা বুঝতেই পারে না যে তারা তাদের লক্ষ্যের আরও দশটি নুড়িপাথর কাছাকাছি পৌঁছে গেছে।
তাই ছোট ছোট কাজকে কখনো অবহেলা করবেন না।
ধীরগতির অগ্রগতিকে তুচ্ছ ভাববেন না।
ফলাফল সঙ্গে সঙ্গে চোখে না পড়লে হতাশ হবেন না।
আপনার কলসে নুড়িপাথর ফেলে যেতে থাকুন।
শিখতে থাকুন।
নিজেকে উন্নত করতে থাকুন।
সামনের দিকে এগিয়ে যেতে থাকুন।
কারণ একদিন জলের স্তর এতটাই উপরে উঠবে যে সবাই তা দেখতে পাবে। মানুষ হয়তো একে রাতারাতি পাওয়া সাফল্য বলবে, কিন্তু আপনি সত্যটা জানবেন।
তাই ধীরগতির জন্য থেমে যাবেন না। জলের স্তর মাপবেন না। মাপুন আপনার পুনরাবৃত্ত প্রচেষ্টা। আগের রাতেই আপনার জিমের পোশাক গুছিয়ে রাখুন। আপনার কাজের নথি (ডকুমেন্ট) খুলুন। বিভ্রান্তিকে ‘না’ বলুন। একদিন, কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই, আপনি আরেকটি নুড়িপাথর ফেলবেন, আর জল আপনার নাগালে পৌঁছে যাবে। সেটা আপনার ভাগ্য নয়। সেটা কোন জাদুও নয়। সেটা হবে বিজ্ঞানের নিয়ম। সেটা হবে আপনার নিজের সৃষ্টি।
যারা থেমে যায় না, তাদের জন্য জলের স্তর সবসময়ই উপরে ওঠে।
তাই এখনই পরের নুড়িপাথরটি ফেলে দিন।

No comments