একজন “বোকা” মা ও তার বিশ্বজয়ী মেয়ে— আশিস কুমার পণ্ডা
পৃথিবীতে বুদ্ধিমান মানুষের যেমন অভাব নেই, তেমনি “বোকা” মানুষেরও কোনও অভাব নেই। বরং অনেক সময় এই তথাকথিত “বোকা” মানুষগুলোর জন্যই পৃথিবীটা এখনও এতটা মানবিক, এতটা সুন্দর। আমেরিকা…
একজন “বোকা” মা ও তার বিশ্বজয়ী মেয়ে— আশিস কুমার পণ্ডা
পৃথিবীতে বুদ্ধিমান মানুষের যেমন অভাব নেই, তেমনি “বোকা” মানুষেরও কোনও অভাব নেই। বরং অনেক সময় এই তথাকথিত “বোকা” মানুষগুলোর জন্যই পৃথিবীটা এখনও এতটা মানবিক, এতটা সুন্দর। আমেরিকার বিখ্যাত সংগীতশিল্পী ফ্র্যাঙ্ক জাপ্পা একবার মজা করে বলেছিলেন—“এই পৃথিবীতে দুটি জিনিসের কখনও অভাব হবে না—হাইড্রোজেন আর বোকা মানুষ!”
কিন্তু কখনও কখনও এই “বোকা” মানুষগুলোরাই অসম্ভবকে সম্ভব করে দেখান।
এমনই এক “বোকা” মহিলার নাম দেবরা ম্যাকফ্যাডেন—আমেরিকার ডিপার্টমেন্ট অফ হেলথ এন্ড হিউমান সার্ভিসের কমিশনার। ১৯৯৩ সালে তিনি রাশিয়ার একটি অনাথ আশ্রমে গিয়েছিলেন। সেখানে তিনি দেখলেন মাত্র ছয় বছরের এক ছোট্ট মেয়েকে। তার নাম ছিল তাতিয়ানা— রাশিয়ার ভাষায় শক্তি, সৌন্দর্য ও সহনশীলতার প্রতীক। শিশুটি জন্মেছিল “স্পাইনা বিফিডা” নামের এক জটিল রোগ নিয়ে। কোমরের নীচের অংশ পুরোপুরি অসাড়। ঠিকভাবে হাঁটা তো দূরের কথা, সে স্বাভাবিকভাবে কথাও বলতে পারত না। কিন্তু শিশুটির চোখে ছিল এক অদ্ভুত মায়া। সেই চোখের দিকে তাকিয়ে দেবরা মুহূর্তের মধ্যেই সিদ্ধান্ত নিলেন—তিনি এই শিশুটিকে দত্তক নেবেন।
সবাই তাঁকে থামানোর চেষ্টা করেছিলেন।
কেউ বলেছিলেন—“তোমার জীবন নষ্ট হয়ে যাবে।”
কেউ বলেছিলেন—“এমন একটি অপূর্ণ শিশুকে মানুষ করা অসম্ভব।”
কেউ বলেছিলেন—“ও কখনও স্বাভাবিক জীবন পাবে না।”
কিন্তু ভালোবাসা কখনও হিসেব কষে চলে না। যারা সত্যিকারের ভালোবাসতে জানে, তারা অনেক সময় পৃথিবীর চোখে “বোকা” হয়। কারণ তারা লাভ-ক্ষতির অঙ্ক করে না।
দেবরা সেই বিশেষভাবে সক্ষম শিশুটিকে নিজের মেয়ের মতো বুকে তুলে নিলেন। নেহাতই কপাল জোরে সেই ৬ বছরের অনাথ রাশিয়ান শিশুটি এক ভীষণ বোকা আমেরিকান "মা" পেলো। কিছুদিনের মধ্যেই দেখা গেলো বাচ্চা মেয়েটি তার মাকে প্রাণের চেয়েও বেশি ভালোবাসে। ধীরে ধীরে দেবরা বুঝতে পারলেন, তাঁর মেয়ের পা অচল হলেও, শরীরের উপরের অংশ কিন্তু ভীষণ শক্তিশালী। বিশেষ করে হাত, কাঁধ এবং পিঠের শক্তি ছিল অসাধারণ।
একদিন তিনি মেয়েকে নিয়ে গেলেন একটি রেস ট্র্যাকে। তিনি ফিনিশ লাইনে দাঁড়িয়ে বললেন—“তুমি শুধু আমার কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করো।” সেদিন থেকেই শুরু হয় মা-মেয়ের এক অসাধারণ যাত্রা। ছোট্ট তাতিয়ানা প্রাণপণে হুইলচেয়ার চালিয়ে মায়ের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করত। ধীরে ধীরে সেই চেষ্টাই একদিন রূপ নিল স্বপ্নে। তার গতি এত দ্রুত হয়ে উঠল যে স্কুল পর্যায়ের একের পর এক রেকর্ড ভাঙতে শুরু করল।
মাত্র পনেরো বছর বয়সে 2004 Summer Paralympics-এ আমেরিকার প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পেল তাতিয়ানা। এত কম বয়সে এর আগে খুব কম ক্রীড়াবিদই এই সুযোগ পেয়েছিলেন। সেদিন স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে বসে তাঁর “বোকা মা”-র চোখে আনন্দের অশ্রু ঝরছিল। তাতিয়ানা সেই অলিম্পিক থেকে একটি রৌপ্য এবং একটি ব্রোঞ্জ পদক জিতে ফিরলেন।
কিন্তু মেয়েটি খুশি ছিল না।
মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে সে কাঁদতে কাঁদতে বলেছিল—“মা, আমি একদিন বিশ্বের সেরা হবো।”
আর সে কথা সে রেখেছিল। 2008 Summer Paralympics-এ চারটি পদক। 2012 Summer Paralympics-এ আরও চারটি পদক, যার মধ্যে তিনটি স্বর্ণ। এরপর বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে একের পর এক সোনা জিতে তিনি বিশ্ব ইতিহাসে নিজের নাম লিখে ফেললেন।
কিন্তু এখানেই থামেননি মা-মেয়ে। এবার তাঁরা বেছে নিলেন আরও কঠিন চ্যালেঞ্জ—ম্যারাথন।
অনেকে বলেছিলেন—“এত কিছু অর্জন করেছ, এবার থামো।”
কিন্তু স্বপ্ন কখনও থামে না।
২০১৩ সালে তাতিয়ানা একসঙ্গে চারটি বড় ম্যারাথন জিতে “গ্র্যান্ড স্ল্যাম” সম্পূর্ণ করলেন। তারপর পরপর আরও কয়েক বছর সেই সাফল্য ধরে রাখলেন। 2004 থেকে 2020 paralympic-এ 20 টি মেডেল জিতে তিনি অলিম্পিক ইতিহাসে এক অনন্য নজীর সৃষ্টি করেছেন।
তাতিয়ানাকে যখনই জিজ্ঞেস করা হয়েছে—“তোমার সাফল্যের রহস্য কী?”
তিনি একটাই উত্তর দিয়েছেন—“আমার মা।” তিনি বলেছেন—“ছোটবেলা থেকে প্রতিটি রেসে আমি শুধু একটা জিনিস ভাবতাম—ফিনিশ লাইনে মা দাঁড়িয়ে আছেন। আমাকে তাঁর কাছে পৌঁছাতেই হবে। আর পৌঁছাতে হবে সবার আগে।”
অন্যদের কাছে সেটা ছিল প্রতিযোগিতা। তাতিয়ানার কাছে সেটা ছিল—“মায়ের কাছে পৌঁছানোর পথ।”
এই গল্প শুধু একজন ক্রীড়াবিদের সাফল্যের গল্প নয়—ভালোবাসা, বিশ্বাস আর মানবতার গল্প।
কখনও কখনও পৃথিবী যাদের “বোকা” বলে, তারাই আসলে সবচেয়ে বড় সাহসী মানুষ। কারণ তারা অসম্ভবকে ভয় পান না। তারা মানুষকে বোঝা হিসেবে দেখেন না। তারা ভালোবাসতে জানেন। হয়তো পৃথিবী আজও টিকে আছে এই “বোকা” মানুষগুলোর জন্যই—যারা এখনও নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসতে পারেন।

No comments