ভুলটা গণিতে নয়, যোগাযোগে: আশিস কুমার পন্ডা
এক নার্সারি স্কুলে ম্যাডাম গণিত শেখাচ্ছিলেন। এক ছাত্রকে তিনি প্রশ্ন করলেন, ধরো, আমি যদি তোমাকে একটা আপেল দিই, তারপর আর একটা দিই, তারপর আরও একটা দিই—তাহলে তোমার কাছে মোট ক’টা আপেল হবে?
ছাত্…
ভুলটা গণিতে নয়, যোগাযোগে: আশিস কুমার পন্ডা
এক নার্সারি স্কুলে ম্যাডাম গণিত শেখাচ্ছিলেন। এক ছাত্রকে তিনি প্রশ্ন করলেন, ধরো, আমি যদি তোমাকে একটা আপেল দিই, তারপর আর একটা দিই, তারপর আরও একটা দিই—তাহলে তোমার কাছে মোট ক’টা আপেল হবে?
ছাত্রটি বলল, “ম্যাডাম, চারটে।”
শিক্ষিকা অবাক হলেন। আবার জিজ্ঞাসা করলেন,
“ভালো করে শোনো—একটা আপেল, তারপর আর একটা, তারপর আর একটা—এবার বলো, ক’টা?”
ছাত্রটি আবারও বলল, “ম্যাডাম, চারটে।”
এবার শিক্ষিকা একটু অসহিষ্ণু হয়ে পড়লেন। শিক্ষিকার মনে হলো, এত ভালো ছাত্র হয়ে এত সহজ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারছে না!
কিন্তু তিনি হাল ছাড়লেন না। প্রশ্নটা ঘুরিয়ে দিলেন।
তিনি বললেন, “ঠিক আছে, এবার বলো—আমি যদি তোমাকে একটা পেয়ারা দিই, তারপর আর একটা দিই, তারপর আর একটা দিই—তাহলে তোমার কাছে ক’টা পেয়ারা হবে?”
ছাত্রটি হাসিমুখে বলল, “ম্যাডাম, খুব সহজ—তিনটে।”
শিক্ষিকা এবার অবাক হয়ে গেলেন। তিনি আবার আগের প্রশ্নটাই করলেন, “এবার বলো, আমি যদি তোমাকে একটা আপেল দিই, আর একটা দিই, আর একটা দিই—কয়টা হবে?”
ছাত্রটি বলল, “ম্যাডাম, চারটে।”
এবার শিক্ষিকা বিরক্ত হয়ে বললেন,
“আপেল চারটে আর পেয়ারা তিনটে কেন?”
ছাত্রটি সহজ ভাবে উত্তর দিল, “ম্যাডাম, আমার ব্যাগে আগে থেকেই একটা আপেল আছে। আপনি যদি তিনটে আপেল দেন, তবে মোট চারটে আপেল হবে, আর যদি তিনটে পেয়ারা দেন তিনটে পেয়ারা হবে।”
ছাত্রের হিসাবে সে ঠিক। ম্যাডামের হিসাবে তিনিও ঠিক।
এই ছোট্ট গল্পটা একটা বড় সত্যি শেখায়।
অনেক সময় যিনি বোঝাচ্ছেন তিনি ঠিক, আর যিনি শুনছেন তিনিও ঠিক—তবু যোগাযোগ ঠিকমতো হচ্ছে না। কারণ, দু’জনের ভাবনা আলাদা আলাদা জায়গা থেকে শুরু হচ্ছে। এটাই হলো যোগাযোগের (communication) আসল সমস্যা।
যোগাযোগ মানে শুধু বলা আর শোনা নয়, পুরো প্রক্রিয়াটা এক বদ্ধ বর্তনীতে (Closed loop) কাজ করে। বক্তা থেকে শুরু হয়ে বার্তা সাতটা ধাপের মাধ্যমে শ্রোতার প্রতিক্রিয়া হয়ে আবার বক্তার কাছে ফিরে আসে।
বক্তা → সংকেতায়ন (Coding)→ বার্তা → মাধ্যম→ কোলাহল → সংকেতোদ্ধার(Decoding) → শ্রোতা→ প্রতিক্রিয়া → বক্তা
যোগাযোগ অসম্পূর্ণ থেকে গেলে অনেক ছোট ছোট ভুল ধীরে ধীরে বড় সমস্যায় পরিণত হয়।
কারণ কী? : —
আসলে, আমরা সবাই নিজেদের মাথার ভিতর একটা অদৃশ্য ব্যাগ নিয়ে বসে আছি। সেই ব্যাগে জমা থাকে আমাদের পুরানো অভিজ্ঞতা, মানসিক অবস্থা, পূর্বধারনা, আবেগের বাধা, সাংস্কৃতিক পার্থক্য, উপেক্ষার মনোভাব, ইত্যাদি। আর এখানেই শুরু হয় ভুল বোঝাবুঝি— ঘরে, অফিসে, সম্পর্কে।
তাহলে উপায় কী?: —
Ø বলো কম, শোনো বেশি: ২টা কান, ১টা মুখ—অনুপাতটা মনে রাখো। তা ছাড়া সামনের মানুষটার ব্যাগে কী আছে, সেটা না জেনে নিজের আপেল গুনে গেলে কিছু লাভ হবে না।
Ø উদ্দেশ্য ঠিক করো: নিজেকে জিজ্ঞাসা কর, “আমি কি শুধু বলতে চাই, নাকি সত্যিই চাই ও বুঝুক?”
Ø সহজ শব্দ বেছে নাও: একই কথাকে একের বেশিভাবে বলা যায়। যে কথাটা সবচেয়ে সহজ, সেই কথাটা বেছে নাও। অস্পষ্টতা মানেই কোলাহল (Noise)।
Ø মানুষ শব্দ শোনে ৭%, বাচনভঙ্গী শোনে ৩৮%, বাকিটা শরীরের ভাষা দেখে। তাই বলার সময় শব্দ + টোন + শরীরের ভাষা মেলাও। মুখে বলছ “রাগ করিনি”, কিন্তু চোয়াল শক্ত। কেউ বিশ্বাস করবে না।
Ø আবেগ সামলাও: রাগ, ঈর্ষা, অভিমান থাকলে কথা বলো না। আগে শান্ত হও, তারপর কথা বলো। আবেগের কোলাহল (Noise) সবচেয়ে বড় কোলাহল।
Ø ছোট করে, একটা একটা কথা বলো: একের পর এক, ১০টা কথা বললে শ্রোতার পক্ষে ২টার বেশি মনে রাখা সম্ভব হয়ে ওঠে না। তাই, একটা কথা বলো, থামো, প্রতিক্রিয়া নাও, তারপর পরেরটা শুরু কর।
Ø প্রতিক্রিয়া (Feedback) চাও: জিজ্ঞাসা করো, “আমি যা বললাম, তুমি কী বুঝলে?”
Ø মিলিয়ে নাও: শ্রোতার কথা নিজের ভাষায় পুনরাবৃত্তি করো। “তুমি কি এটাই বোঝাতে চাইছ?”—এই একটা প্রশ্ন অনেক যোগাযোগকে সম্পূর্ণ করে তোলে।
শেষ কথা: —
সেদিন ক্লাসে ভুল ছিল না শিক্ষিকার, ভুল ছিল না ছোট্ট ছেলেটারও। পার্থক্য ছিল শুধু ভাবনায়। জীবনেও ঠিক এমনটাই হয়। আমরা অনেক সময় নিজের দিকটা বুঝিয়ে বলতে পারি না, আবার অন্যের অবস্থাটাও বোঝার চেষ্টা করি না। ফলে একই কথা দুইজনের কাছে দুই রকম অর্থ নিয়ে পৌঁছায়।
তাই যোগাযোগ মানে শুধু কথা বলা নয়—সামনের মানুষটার জায়গায় দাঁড়িয়ে ভাবতে পারাও। কারণ, অনেক তর্ক, অনেক দূরত্ব, অনেক ভুল বোঝাবুঝি—শুধু একটু ধৈর্য আর বোঝাপড়ার অভাবেই তৈরি হয়।
মনে রাখবে—
প্রতিটা মানুষের ব্যাগে একটা “আগের আপেল” থাকেই। তার অভিজ্ঞতা, কষ্ট, ভয়, ভাবনা—সব মিলিয়ে সে তোমার কথা শুনে। সেই কারণেই, মানুষকে কিছু বলা বা শোনার আগে তাকে একটু বোঝার চেষ্টা কর।
হয়তো দেখবে, সমস্যাটা গণিতে ছিল না—যোগাযোগেই ছিল।

No comments