গরু কি সত্যিই আমাদের দুধ দেয়? —আশিস কুমার পণ্ডা
স্কুলজীবনে আমরা প্রায় সবাই ‘গরু’ রচনায় লিখেছি—“গরু আমাদের দুধ দেয়।” কথাটি শুনতে স্বাভাবিক হলেও একদিন একজন শিক্ষক তাঁর ছাত্রদের একটি ভিন্ন প্রশ্ন করলেন।“গরু কি সত্যিই আমাদের দুধ দ…
গরু কি সত্যিই আমাদের দুধ দেয়? —আশিস কুমার পণ্ডা
স্কুলজীবনে আমরা প্রায় সবাই ‘গরু’ রচনায় লিখেছি—“গরু আমাদের দুধ দেয়।” কথাটি শুনতে স্বাভাবিক হলেও একদিন একজন শিক্ষক তাঁর ছাত্রদের একটি ভিন্ন প্রশ্ন করলেন।
“গরু কি সত্যিই আমাদের দুধ দেয়?”
এক ছাত্র অবাক হয়ে বলল, “সে কী স্যার! আমরা তো গরুর দুধই খাই!”
শিক্ষক হেসে বললেন, “গরু নিজে থেকে কাউকে দুধ দেয় না। দুধ পেতে হলে ভোরবেলা উঠতে হয়, গোয়ালে যেতে হয়, গরুকে সামলাতে হয়, ধৈর্য ধরে দুধ দোহন করতে হয়। তবেই দুধ মেলে।”
কথাটি শুনতে সাধারণ মনে হলেও এর মধ্যে জীবনের এক গভীর শিক্ষা লুকিয়ে আছে।
আমরা অনেক সময় মনে করি, সাফল্য, সুখ, সম্মান বা স্বীকৃতি যেন কোন না কোনভাবে আমাদের কাছে এসে পৌঁছাবে। আমরা স্বপ্ন দেখি, পরিকল্পনা করি, আশা করি—কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণের জন্য যে মূল্য দিতে হয়, সেই পরিশ্রমের অংশটুকু অনেক সময় ভুলে যাই।
প্রকৃতির নিয়ম খুবই সরল। বীজ বপন না করলে ফসল জন্মায় না। নদীতে জাল না ফেললে মাছ ধরা যায় না। পাহাড়ের চূড়ায় উঠতে চাইলে পথের কষ্ট মেনে নিতেই হয়।
জীবনের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম নেই।
যে কৃষক রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে মাঠে কাজ করেন, ফসল তার ঘরেই ওঠে। যে ছাত্র নিয়মিত পড়াশোনা করে, জ্ঞানের ভাণ্ডার তারই সমৃদ্ধ হয়। যে শিল্পী বছরের পর বছর অনুশীলন চালিয়ে যায়, তার হাতেই একদিন সৃষ্টি হয় অনন্য শিল্পকর্ম। আর যে মানুষ ব্যর্থতাকে শেষ কথা মনে না করে আবার নতুন করে শুরু করতে পারে, সাফল্য শেষ পর্যন্ত তার কাছেই ধরা দেয়।
সমস্যা হলো, আমরা অনেকেই ফল চাই, কিন্তু প্রক্রিয়াটিকে ভালোবাসতে শিখি না। গন্তব্যের স্বপ্ন দেখি, কিন্তু পথচলার প্রস্তুতি নিই না। ফলে যখন প্রত্যাশা আর বাস্তবতার মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়, তখন জন্ম নেয় হতাশা। আমরা ভাগ্যকে দোষ দিই, পরিস্থিতিকে দোষ দিই, কখনও কখনও অন্য মানুষকেও দোষারোপ করি। অথচ সত্যটা হলো, অনেক ক্ষেত্রে সাফল্য থেকে আমাদের দূরে রাখে বাইরের কোন বাধা নয়, বরং চেষ্টায় ঘাটতি।
আজকের যুগে দ্রুত ফল পাওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যেখানে একটি বোতাম চাপলেই অনেক কিছু হাতের নাগালে চলে আসে। কিন্তু জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান অর্জনগুলোর কোন শর্টকাট নেই। তাই শুধু ইচ্ছা করলেই হবে না; ইচ্ছাকে কাজে রূপ দিতে হবে। শুধু সুযোগের অপেক্ষায় বসে থাকলে চলবে না; নিজেকেও সুযোগের যোগ্য করে তুলতে হবে।
মনে রাখবেন—
জীবন কাউকে প্রস্তুত সাফল্য উপহার দেয় না; সাফল্য অর্জন করে নিতে হয়। স্বপ্ন দেখার অধিকার সবার আছে, কিন্তু স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার সাহস সবার থাকে না। শেষ পর্যন্ত জীবন তাদেরই পুরস্কৃত করে, যারা শুধু দুধের আশা করে না, বরং দুধ দোহনের জন্য ভোরবেলা উঠতেও প্রস্তুত থাকে।

No comments