Page Nav

HIDE

Grid Style

GRID_STYLE

Post/Page

Weather Location

Breaking News:

latest

একটু থামুন, তারপর সিদ্ধান্ত নিন (Pause and decide): — স্বরূপ কিশেন: আশিস কুমার পণ্ডা

একটু থামুন, তারপর সিদ্ধান্ত নিন (Pause and decide): — স্বরূপ কিশেন: আশিস কুমার পণ্ডা
একটা সময় ছিল, যখন ক্রিকেট শুধু বড় বড় স্টেডিয়ামের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। ক্রিকেট বেঁচে থাকত শহরের ধুলোভরা ময়দানগুলোতে। ছোট ছোট ছেলেরা রোদ মাথায় নি…

 




একটু থামুন, তারপর সিদ্ধান্ত নিন (Pause and decide): — স্বরূপ কিশেন: আশিস কুমার পণ্ডা


একটা সময় ছিল, যখন ক্রিকেট শুধু বড় বড় স্টেডিয়ামের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। ক্রিকেট বেঁচে থাকত শহরের ধুলোভরা ময়দানগুলোতে। ছোট ছোট ছেলেরা রোদ মাথায় নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকত—প্রিয় খেলোয়াড়দের ব্যাটিং, বোলিং, ফিল্ডিং দেখবে বলে। তাদের চোখে থাকত স্বপ্ন।


সত্তরের দশকে, মুম্বাইয়ের এমনই এক ক্রিকেট মাঠে এক ছোট্ট ছেলে দাঁড়িয়ে ছিল অটোগ্রাফ নেওয়ার আশায়। চারদিকে ভিড়—কেউ বিখ্যাত ব্যাটসম্যানের পিছনে দৌড়চ্ছে, কেউ নামী বোলারের। কিন্তু ছেলেটি এগিয়ে গেল অন্য একজনের দিকে। তিনি কোন তারকা ক্রিকেটার নন। তিনি ছক্কা মারেন না, দুর্দান্ত ক্যাচও ধরেন না। তবু নিজের শান্ত, নির্ভুল উপস্থিতির জন্য তিনিও ছিলেন এক কিংবদন্তি।


তিনি ছিলেন ম্যাচের আম্পায়ার—স্বরূপ কিশেন।


স্বরূপ কিশেনের জন্ম হয়েছিল জম্মু ও কাশ্মীরের শ্রীনগরে। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি উইকেটকিপার-ব্যাটসম্যান হিসেবে ক্রিকেট খেলেছেন। পরে আইনজীবী হন এবং অডিটর-জেনারেলের অফিসে কাজ করেন। এরপর তিনি ক্রিকেট আম্পায়ারিংয়ের জগতে আসেন। ১৯৬৯ থেকে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত তিনি প্রথম-শ্রেণির ক্রিকেটে আম্পায়ারিং করেন এবং নিজের শান্ত স্বভাব, নিরপেক্ষতা ও তীক্ষ্ণ বিচারবুদ্ধির জন্য সবার শ্রদ্ধা অর্জন করেন। ক্রিকেটে অসাধারণ অবদানের জন্য তিনি প্রথম ভারতীয় ক্রিকেট আম্পায়ার হিসেবে পদ্মশ্রী সম্মান পান।


তবে শুধু তাঁর সাফল্যের জন্য নয়, মানুষ তাঁকে মনে রাখত তাঁর প্রাণখোলা ব্যক্তিত্বের জন্যও। স্বাস্থ্যবান চেহারা আর হাসিখুশি উপস্থিতির জন্য অনেকে তাঁকে বিখ্যাত “লরেল অ্যান্ড হার্ডি” জুটির হার্ডির সঙ্গে তুলনা করতেন। তাঁকে একবার দেখলে ভোলা যেত না।


যখন ছোট্ট ছেলেটি তাঁর কাছে অটোগ্রাফ চাইলো, তখন স্বরূপ কিশেন এক অদ্ভুত কাজ করলেন। শুধু সই করলেন না। তার আগে লিখলেন তিনটি শব্দ—


“Pause and decide.” অর্থাৎ—“একটু থামো, তারপর সিদ্ধান্ত নাও।”


ছেলেটি অবাক হয়ে গেল। বেশিরভাগ খেলোয়াড় শুধু সই করেই চলে যাচ্ছিলেন। কিন্তু এই আম্পায়ার একটা বার্তা লিখলেন কেন?


ছেলেটি কারণ জিজ্ঞেস করতেই স্বরূপ কিশেন হেসে বললেন—“আম্পায়ারিং করতে গিয়ে আমি একটা জিনিস শিখেছি—তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত নিলে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। কিন্তু তুমি যদি একটু থামো, তাহলে এমন অনেক কিছু দেখতে পাবে, যা তাড়াহুড়োয় চোখ এড়িয়ে যায়।


ব্যাটসম্যানের মুখের অভিব্যক্তি বুঝতে পারবে।


উইকেটকিপারের প্রতিক্রিয়া দেখতে পাবে।


খেলার চাপ আর আওয়াজের মধ্যেও ছোট ছোট সত্যিগুলো চোখে পড়বে।


এই ছোট্ট বিরতিটাই মানুষকে পরিষ্কারভাবে ভাবতে সাহায্য করে।”


সত্যি বলতে কী — এই শিক্ষা শুধু আম্পায়ারদের জন্য নয়। আমাদের সবার জন্য।


আজ আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যেখানে সবকিছু খুব দ্রুত চাই। দ্রুত উত্তর, দ্রুত সিদ্ধান্ত, দ্রুত প্রতিক্রিয়া। মানুষ এখন বুঝে ওঠার আগেই রেগে যায়, শুনে ওঠার আগেই বিচার করে ফেলে।


আমরা ভাবি, খুব দ্রুত কাজ করাই বুদ্ধিমানের লক্ষণ।


কিন্তু অনেক সময় আসল প্রজ্ঞা লুকিয়ে থাকে একটুখনি থেমে যাওয়ার মধ্যে।


একটু থামা আমাদের ভাবতে শেখায়। পরিস্থিতি বুঝতে শেখায়। আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখায়।


অনেক ঝগড়া এড়ানো যেত, যদি কেউ কথা বলার আগে একটু থামত।


অনেক সম্পর্ক ভাঙত না, যদি কেউ রাগের মুহূর্তে একটু ভেবে নিত।


অনেক ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া হত না, যদি মানুষ একটু সময় নিয়ে ভাবত।


থামার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো—এটা আমাদের অন্তরের কণ্ঠস্বর শুনতে সাহায্য করে। তাড়াহুড়োয় আমরা শুধু আওয়াজ শুনি। কিন্তু একটু থামলে সত্যিটা শুনতে পাই।


যোগাযোগের ক্ষেত্রেও এই বিরতি খুব গুরুত্বপূর্ণ। যে মানুষ কথা বলার আগে একটু ভাবে, তাকে অনেক বেশি শান্ত, পরিণত আর বুদ্ধিমান মনে হয়। কখনও কখনও কয়েক সেকেন্ডের নীরবতা, অনেক তাড়াহুড়ো করা কথার চেয়ে বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে।


তাই বড় বিচারকরা থামেন।


ভালো নেতারা থামেন।


ভালো শিক্ষকরা থামেন।


আর ভালো আম্পায়াররাও থামেন।


কারণ, তাড়াহুড়োয় নেওয়া সিদ্ধান্তের প্রভাব অনেক সময় বহুদিন পর্যন্ত থেকে যায়।


তাই পরের বার রাগ উঠলে—একটু থামুন।


কাউকে উত্তর দেওয়ার আগে—একটু থামুন।


গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে—একটু থামুন।


কারও সম্পর্কে বিচার করার আগে—একটু থামুন।


হয়তো এই কয়েক সেকেন্ডের বিরতিই আপনাকে বহু বছরের আফসোস থেকে বাঁচিয়ে দেবে।

No comments