মাত্র পনেরো ডলার বদলে দিয়েছিল একটি জীবন: আশিস কুমার পন্ডা
১৯৮২ সাল। কেনিয়ার এক ছোট্ট শহরে পড়াশোনা করত এক ছেলে—ক্রিস এমবুরু। মেধাবী, পরিশ্রমী, স্বপ্নভরা একটা ছেলে। কিন্তু একটা বড় সমস্যা ছিল—তার পরিবারের পক্ষে হাই স্কুলের ফি দেওয়া স…
মাত্র পনেরো ডলার বদলে দিয়েছিল একটি জীবন: আশিস কুমার পন্ডা
১৯৮২ সাল। কেনিয়ার এক ছোট্ট শহরে পড়াশোনা করত এক ছেলে—ক্রিস এমবুরু। মেধাবী, পরিশ্রমী, স্বপ্নভরা একটা ছেলে। কিন্তু একটা বড় সমস্যা ছিল—তার পরিবারের পক্ষে হাই স্কুলের ফি দেওয়া সম্ভব হচ্ছিল না। পরিস্থিতি এতটাই খারাপ হয়ে গেল যে স্কুল থেকে তাকে বের করে দেওয়ার কথাও উঠল।
অনেক শিশুর জীবন এভাবেই থেমে যায়। কিন্তু ভাগ্য তখন অন্য গল্প লিখছিল।
হাজার হাজার মাইল দূরে, সুইডেনে, হিল্ডে ব্যাক নামে ৮০ বছরের এক অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষিকা একটি ছোট্ট বিজ্ঞাপন পড়ছিলেন। সেখানে লেখা ছিল—আফ্রিকার কিছু দরিদ্র ছাত্রছাত্রীর পড়াশোনা চালিয়ে যেতে সাহায্য দরকার। প্রতি টার্মে মাত্র ১৫ ডলার।
মাত্র পনেরো ডলার। অনেকের কাছে হয়তো খুবই ছোট অঙ্ক। কিন্তু হিল্ডে ব্যাক সেটাকেই গুরুত্ব দিলেন। বিজ্ঞাপনের একটি নামের উপরে তার চোখ আটকে গেল— “Chris Mburu, Kenya.”
হিল্ডে ব্যাক কোন প্রতিদান, পরিচয় বা কৃতজ্ঞতার আশা না করেই প্রতি টার্মে ১৫ ডলার পাঠাতে শুরু করলেন। তার কাছে এটা ছিল নিঃশব্দে করা এক মানবিক কাজ—এক অচেনা শিশুর জীবনে বপন করা এক ছোট্ট আশার বীজ।
আর সেই ছোট্ট সাহায্যই বদলে দিল ক্রিসের পুরো জীবন।
স্কুল থেকে তাকে আর বের করে দেওয়া হলো না। সে পড়াশোনা চালিয়ে গেল। শুধু তাই নয়, সে দুর্দান্ত ফল করতে লাগল। পরে নাইরোবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম সেরা ছাত্র হয়ে উঠল। তার মেধা তাকে নিয়ে গেল হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে সে স্কলারশিপ পেল। এক দরিদ্র ছাত্র থেকে ক্রিস ধীরে ধীরে হয়ে উঠলেন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনজীবী। পরে তিনি জাতিসংঘেও (UNO) কাজ করেন।
সাফল্য, সম্মান, প্রতিষ্ঠা—সবই এল। কিন্তু তিনি কখনও ভুললেন না— কোথাও এক অচেনা মানুষ একদিন তার ওপর বিশ্বাস রেখেছিল মাত্র পনেরো ডলার দিয়ে।বহু বছর ধরে সেই কৃতজ্ঞতা তিনি হৃদয়ে বহন করলেন। একদিন ঠিক করলেন—যে মানুষটি তার জীবন বদলে দিয়েছিলেন, তাকে খুঁজে বের করতেই হবে। তিনি সুইডেনের দূতাবাসের সাহায্য নিলেন।
অবশেষে খুঁজে পাওয়া গেল হিল্ডে ব্যাককে।
ক্রিস সুইডেনে গেলেন তাকে দেখতে। তিনি ভেবেছিলেন, হয়তো কোনো ধনী মহিলার সঙ্গে দেখা হবে। কিন্তু গিয়ে দেখলেন—একজন একেবারে সাধারণ অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষিকা। হিল্ডে নিজেও অবাক হয়ে গেলেন। তিনি ভাবতেই পারছিলেন না—মাত্র পনেরো ডলারের জন্য কেউ এত দূর, কেনিয়া থেকে সুইডেন পর্যন্ত চলে আসতে পারে!
কিন্তু ক্রিস বললেন—
“আমি শুধু আপনাকে ধন্যবাদ জানাতে আসিনি। আমি চাই, আপনার এই দয়া আরও অনেক শিশুর জীবনে পৌঁছে যাক।” তারপর ক্রিস কেনিয়ায় “Hilde Back Education Fund (HBEF)” নামে একটি স্কলারশিপ ফান্ড শুরু করেন।
এরপর জানা গেল আরও হৃদয়স্পর্শী এক সত্যি।
হিল্ডে ব্যাক নিজেও ছোটবেলায় ভয়ংকর কষ্টের মধ্য দিয়ে গিয়েছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়, নাৎসি জার্মানিতে ইহুদিদের ওপর অত্যাচার চলছিল। ইহুদি শিশুদের সরকারি স্কুলে পড়ার অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। মাত্র ১৬ বছর বয়সে হিল্ডেকে শরণার্থী হিসেবে সুইডেনে পাঠানো হয়। তার বাবা কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে মারা যান। মা আর কখনও ফিরে আসেননি। হিল্ডে বেঁচে গিয়েছিলেন কারণ এক অচেনা মানুষ তাকে সাহায্য করেছিলেন। সেই ঘটনার পর তিনি মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন—“একদিন আমিও কোনো অচেনা মানুষকে সাহায্য করব।” আর সেই ছোট্ট মানবিক কাজ একদিন হাজার হাজার জীবনে আলো হয়ে ছড়িয়ে পড়ল।
২০০১ সাল থেকে Hilde Back Education Fund কেনিয়ার শত শত ছাত্রছাত্রীকে পড়াশোনার সুযোগ করে দিয়েছে। তাদের মধ্যে অনেকে আজ ডাক্তার, আইনজীবী, শিক্ষক, ইঞ্জিনিয়ার হয়েছেন।
সবচেয়ে সুন্দর বিষয় হলো—যারা একসময় সাহায্য পেয়েছিল, তারাই এখন নতুন ছাত্রদের সাহায্য করছে। কেউ অর্থ দিচ্ছে, কেউ পরামর্শ দিচ্ছে, কেউ পাশে দাঁড়াচ্ছে।
একটা ছোট্ট সাহায্য একসময় একটা আন্দোলনে পরিণত হলো।
এই সত্যি গল্প নিয়েই তৈরি হয়েছে এমি-মনোনীত হলিউড ডকুমেন্টারি চলচ্চিত্র—“A Small Act.”
এই গল্প আমাদের একটা গভীর সত্যি শেখায়—
দয়া কখনও ছোট হয় না। আমরা অনেক সময় ভাবি, পৃথিবী বদলাতে গেলে অনেক টাকা, অনেক ক্ষমতা দরকার। কিন্তু কখনও কখনও, একটা সাহায্যের হাত, একটা উৎসাহের কথা, একটা সুযোগ—বা মাত্র পনেরো ডলারও একটা জীবন বদলে দিতে পারে।
হয়তো আমরা পুরো পৃথিবী বদলাতে পারব না।
কিন্তু একজন মানুষের পৃথিবী বদলে দিতে পারি। আর কখনও কখনও, সেটাই যথেষ্ট।
তাই সুযোগ পেলে সাহায্য করুন। মানুষকে উৎসাহ দিন। অচেনা মানুষকেও ভালোবাসুন।
কারণ আপনি জানেন না—আজ যাকে সাহায্য করছেন, সেই মানুষটাই হয়তো একদিন পৃথিবীকে আলোকিত করবেন।

No comments