Page Nav

HIDE

Grid Style

GRID_STYLE

Post/Page

Weather Location

Breaking News:

latest

ভুলের ইতি ( Mistake out)— আশিস কুমার পন্ডা

ভুলের ইতি ( Mistake out)— আশিস কুমার পন্ডা
১৯৫৬ সালের কথা। ডালাসের টেক্সাস ব্যাংক অ্যান্ড ট্রাস্ট-এ কর্মরত বেটি নেসমিথ গ্রাহাম নামে এক লড়াকু মহিলা সেক্রেটারি নিজের ছোট্ট রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। মাসে মাত্র ৩০০ ডলার আয়, একা হাতে ছো…

 




ভুলের ইতি ( Mistake out)— আশিস কুমার পন্ডা


১৯৫৬ সালের কথা। ডালাসের টেক্সাস ব্যাংক অ্যান্ড ট্রাস্ট-এ কর্মরত বেটি নেসমিথ গ্রাহাম নামে এক লড়াকু মহিলা সেক্রেটারি নিজের ছোট্ট রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। মাসে মাত্র ৩০০ ডলার আয়, একা হাতে ছোট ছেলেকে মানুষ করা—তার জীবন ছিল নিরন্তর সংগ্রামের। কিন্তু তার সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল খুবই সাধারণ—টাইপ করার সময় ভুল হয়ে যাওয়া।


সেই সময় IBM-এর ইলেকট্রিক টাইপরাইটার প্রিন্টিং এর সময় কমিয়ে দিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু ভুল হলে তা ঠিক করা প্রায় অসম্ভব ছিল। একটি ছোট ভুল মানেই পুরো পৃষ্ঠা আবার নতুন করে টাইপ করা। আমেরিকার হাজার হাজার সেক্রেটারির জন্য এটা শুধু অসুবিধা নয়, চাকরি হারানোর ভয়ও ছিল।


বেটি ছিলেন না কোন বিজ্ঞানী, বা কোন ইঞ্জিনিয়ার, তিনি ছিলেন একেবারে সাধারণ একজন কর্মজীবী মহিলা। কিন্তু তার ওপর চাপ ছিল অসাধারণ। প্রতিটি ভুল যেন তাকে একটু করে ব্যর্থতার দিকে ঠেলে দিচ্ছিল।


অনেকে হয়তো এই পরিস্থিতিকে মেনে নিতেন। ভাবতেন—“এটাই নিয়ম, কিছু করার নেই।”


কিন্তু বেটি অন্যভাবে ভাবলেন। তিনি প্রশ্ন করলেন—“আমি কেন বারবার নতুন করে শুরু করব?”


এই একটি প্রশ্নই তার জীবন বদলে দিল।


একদিন তিনি দেখলেন, কয়েকজন শিল্পী জানালার কাচে ছবি আঁকছে। তারা ভুল করলেও পুরোটা মুছে ফেলছে না, বরং সেই জায়গার উপর নতুন করে রং করে দিচ্ছে।


এই দৃশ্য থেকেই তার মনে একটি নতুন ভাবনার জন্ম নিল—'টাইপের ভুলও কি এভাবে ঢেকে দেওয়া যায় না?’


সেই রাতেই তিনি নিজের রান্নাঘরে পরীক্ষা শুরু করে দিলেন। ব্লেন্ডারে সাদা রং মিশিয়ে এমন একটি তরল বানালেন, যা দিয়ে ভুল জায়গা ঢেকে দেওয়া যায়। পরের দিন অফিসে গিয়ে তিনি সেটা ব্যবহার করলেন। ভুল জায়গায় রং লাগিয়ে শুকিয়ে নিয়ে তার উপর আবার টাইপ করলেন।


ফলাফল ছিল একদম নিখুঁত।


শুরুতে এটি ছিল শুধু তার ব্যক্তিগত প্রয়োজন। কিন্তু ধীরে ধীরে অন্য সেক্রেটারিরাও বিষয়টি লক্ষ্য করলেন। তারা বেটির কাছ থেকে সেই “ম্যাজিক পেইন্ট” চাইতে শুরু করলেন। বেটি বাড়িতে বসেই ছোট ছোট বোতলে ভরে এটি বিক্রি করতে লাগলেন—নাম দিলেন “(Mistake Out) মিস্টেক আউট”।


চাহিদা ক্রমশ বাড়তে লাগল। তার ছেলে এবং ছেলের বন্ধুরা রাতে বসে বোতল ভরতে সাহায্য করত। ধীরে ধীরে এটি একটি ছোট উদ্যোগ থেকে ব্যবসায় পরিণত হল। পরে এর নাম রাখা হল Liquid Paper—যা সারা বিশ্বের অফিস সংস্কৃতিতে এক নতুন পরিবর্তন এনে দিল।


তবে এই পথ মোটেই সহজ ছিল না। অনেকেই তাকে গুরুত্ব দেননি, কেউ কেউ উপহাস করেছেন, আবার কেউ অবজ্ঞা করেছেন। তবুও তিনি থামেননি। কারণ তিনি বুঝেছিলেন—'ভুল মানেই শেষ নয়; বরং সেটাই উন্নতির সুযোগ।‘


১৯৭৯ সালে তিনি তার এই ব্যবসা Gillette-এর কাছে ৪৭.৫ মিলিয়ন ডলারে বিক্রি করে দেন। এক ছোট সমস্যার সমাধান তাকে অসাধারণ সাফল্যের জায়গায় পৌঁছে দেয়।


আজ আমাদের হাতে কম্পিউটার, মোবাইল—সব জায়গাতেই ভুল সংশোধনের অসংখ্য উপায় রয়েছে। তবুও আমরা অনেক সময় নিজের ভুল নিয়ে ভেঙে পড়ি।


আমরা ভাবি—


“আমি ব্যর্থ, তাই আবার শুরু করতে হবে।”


“আমি ভুল করেছি, সব শেষ।”


“আমি পারব না, ছেড়ে দিই।”


কিন্তু যদি আমরা বেটির মতো অন্যভাবে ভাবতে শিখি? যদি আমরা নতুন করে শুরু না করে, ভুলকে ঠিক করে এগিয়ে যাই?


খারাপ ফলাফল হতে পারে শিক্ষা।


প্রত্যাখ্যান হতে পারে নতুন পথের ইঙ্গিত।


ভুল হতে পারে উন্নতির সোপান।


জীবনও এক অর্থে একটি টাইপ করা পাতার মতো। একটি ভুলের জন্য পুরোটা ফেলে দেওয়ার প্রয়োজন নেই। সংশোধন করে, নতুনভাবে গড়ে তুলে, সামনে এগিয়ে যাওয়া যায়।


শেষ কথা হলো—'সবসময় নতুন করে শুরু করতে হবে না। অনেক সময় শুধু ভুলটা ঠিক করে এগিয়ে গেলেই যথেষ্ট।‘

No comments