স্মৃতির ব্যাগ:আশিস কুমার পন্ডা
বছরের পর বছর ধরে অর্জুন এমন একটা জিনিস নিয়ে চলছিল, যেটা নিয়ে সে কখনও প্রশ্ন করেনি—কাঁধে ঝোলানো ভারী, পুরানো এক ব্যাকপ্যাক। ব্যাগটা ছিল ছেঁড়া আর জীর্ণ, আর যদিও অন্য কাউকে সে ব্যাগটা দেখাত না, অর্জু…
স্মৃতির ব্যাগ:আশিস কুমার পন্ডা
বছরের পর বছর ধরে অর্জুন এমন একটা জিনিস নিয়ে চলছিল, যেটা নিয়ে সে কখনও প্রশ্ন করেনি—কাঁধে ঝোলানো ভারী, পুরানো এক ব্যাকপ্যাক। ব্যাগটা ছিল ছেঁড়া আর জীর্ণ, আর যদিও অন্য কাউকে সে ব্যাগটা দেখাত না, অর্জুন প্রতিদিন তার ভার অনুভব করত। সে যেখানেই যেত, মনে হতো এই ব্যাগটা তাকে এগোতে দিচ্ছে না।
একদিন স্কুলের ভ্রমণে অর্জুন আর তার সহপাঠীরা একটা উঁচু পাহাড়ের পাদদেশে পৌঁছাল। তাদের শিক্ষক বললেন, “এই পাহাড়ের চূড়া থেকে পৃথিবীকে অন্যভাবে দেখা যায়—সেখানে দাঁড়ালে মন শান্ত হয়ে যায়।“
সবাই খুব উৎসাহ নিয়ে পাহাড় চড়তে শুরু করল।
অর্জুনও উঠতে শুরু করল… কিন্তু কয়েক পা যেতেই সে ধীরে হয়ে গেল। ব্যাগটা যেন আরও ভারী হয়ে উঠল। সেটা তাকে নিচের দিকে টানতে লাগল। সে পিছলে পড়ল, হোঁচট খেল। তার পিঠ ঘামে ভিজে গেল। অবশেষে সে ক্লান্ত আর হতাশ হয়ে বসে পড়ল।
পাহাড়ের পাশের ক্ষেতে কাজ করছিলেন এক বৃদ্ধ মালি, অর্জুনকে দেখে তিনি এগিয়ে এলেন। শান্ত গলায় তিনি জিজ্ঞেস করলেন,“বাবা… এই ব্যাগে এমন কী ধন আছে, যে তুমি জীবন বিপন্ন করে এটাকে নিয়ে পাহাড়ে উঠছ?”
অর্জুন গর্ব করে বলল, “ধন নয়… কিন্তু এটাই আমার সবকিছু।”
বৃদ্ধটি মৃদু হেসে বললেন, “বুঝলাম! কিন্তু তুমি কি নিশ্চিত, এই সব জিনিসপত্র ভ্রমণের জন্য সত্যিই প্রয়োজন?”
অর্জুন চোখ বন্ধ করে ব্যাগের ভেতরটা দেখতে পেল। সে ধীরে ধীরে বলল, “এর ভেতরে আছে একটা শীতের কোট, আমার ছোটবেলার কিছু পুরস্কার, কিছু পুরোনো সম্পর্কের স্মৃতি, আমার ব্যর্থতার ডায়েরি… এটাই তো আমার জীবনের গল্প। আমি কীভাবে এগুলো ছেড়ে দিই?”
বৃদ্ধ মৃদু হেসে বললেন, “বাবা… তুমি গরমের দিনে শীতের কোট বয়ে বেড়াচ্ছ! তুমি সেই দুঃখগুলো বয়ে বেড়াচ্ছ, যেগুলো অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে। তুমি অতীতের জৌলুস আঁকড়ে ধরে ভবিষ্যতের দিকে এগোতে চাইছ। তুমি আসলে এক টুকরো অতীত নয়, অতীতের পাহাড় বয়ে চলেছ। বর্তমান পথের জন্য যা দরকারি নয়, সেটাই বাধা হয়ে দাঁড়ায়। যা তোমাকে নিচে টেনে রাখে, সেটা আঁকড়ে ধরে তুমি কখনও উপরে উঠতে পারবে না।”
অর্জুন পাহাড়ের দিকে তাকাল… তারপর নিজের ব্যাগের দিকে।
প্রথমবারের মতো সে বুঝতে পারল—যে জিনিসগুলো তাকে টেনে নামাচ্ছে, সেগুলো নিয়ে সে উপরে উঠতে পারবে না।
তার প্রিয় ব্যাগ খুলে, সে একটা সিদ্ধান্ত নিল।
শীতের কোটটা সে ব্যাগের বাইরে ছুঁড়ে দিল। দুঃখের ডায়েরি ছিঁড়ে ফেলল, যে পুরানো সম্পর্কের স্মৃতিগুলো তাকে কষ্ট দিয়েছিল— তাদের বিদায় দিল, তার পুরানো সাফল্যের অভিজ্ঞানগুলো এক এক করে ব্যাগের বাইরে ছুঁড়ে দিল। অহংকার, রাগ, অভিমান, ইত্যাদি বাকি অপ্রয়োজনীয় জিনিসগুলোও ফেলে দিতেই, ব্যাগটাও খালি হয়ে গেল। একটা গাছের পাশে ব্যাগটা রেখে দিয়ে, সে শুধু একটা জলের বোতল আর একটা লাঠি সঙ্গে রাখল।
যখন সে দাঁড়াল, তার শরীর হালকা লাগল—প্রায় ওজনহীন। সে আবার পাহাড়ে উঠতে শুরু করল। এবার আর সে থামল না। সেদিন সে সবার আগে চূড়ায় পৌঁছাল… আর প্রথমবারের মতো পিছনে না তাকিয়ে হাসল।
ফিরে আসার পথে, অর্জুনের আবার সেই বৃদ্ধের সঙ্গে দেখা হলো। এবার অর্জুনকে একেবারে অন্যরকম লাগছিল। তার চোখেমুখে ক্লান্তির চিহ্ন মাত্র নেই। তাদের মধ্যে হাসির বিনিময় হল, অর্জুন বৃদ্ধকে ধন্যবাদ জানিয়ে জিজ্ঞাসা করল,“একটা শেষ প্রশ্ন—মানুষ কি সত্যিই অতীত বাদ দিয়ে বাঁচতে পারে?”
বৃদ্ধ হেসে বললেন, “খুব ভালো প্রশ্ন। শোনো—
অতীত নিয়ে ভাবা সবসময় খারাপ নয়; সঠিকভাবে ভাবলে তা থেকে অনেক কিছু শেখা যায়।
অতীতের সুখস্মৃতির টান (Nostalgia) সবসময় ক্ষতিকর নয়; মাঝে মাঝে এটা মন ভালো করে এবং সম্পর্ককে গভীর করে।
তুমি অতীতকে পুরোপুরি ভুলতে পারবে না, কিন্তু সেটা তোমার ওপর কীভাবে প্রভাব ফেলবে, সেটা তুমি বদলাতে পারো।
অতীতে বাঁচা মানেই দুর্বলতা নয়; অনেক সময় এটা অসম্পূর্ণ অনুভূতির ইঙ্গিত দেয়।
ছেড়ে দেওয়া মানে ভুলে যাওয়া নয়; বরং স্মৃতির ভার থেকে নিজেকে মুক্ত করা।
মনে রেখো, অতীতকে মনে রাখা আর তাকে বয়ে বেড়ানো—এই দুটো এক জিনিস নয়। তুমি যদি উপরে উঠতে চাও, তাহলে কখনও কখনও যা একসময় গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তা নামিয়ে রাখতেই হয়।”

No comments