Page Nav

HIDE

Grid Style

GRID_STYLE

Post/Page

Weather Location

Breaking News:

latest

নানা রূপে কালী

নানা রূপে কালী
মহাপরাক্রমী মহাবীর দুই অসুর শুম্ভ ও নিশুম্ভ স্বর্গ-মর্ত-পাতাল ত্রিলোকের অধীশ্বর। ইন্দ্র রাজ্যহীন। দেবতারা স্বর্গ থেকে বিতাড়িত। সূর্য, চন্দ্র, কুবের, বরুণ, অগ্নির জন্য যে কাজ নির্দিষ্ট, সেই কাজ করতে লাগল ওই দুই অসুর…

 



নানা রূপে কালী

 


মহাপরাক্রমী মহাবীর দুই অসুর শুম্ভ ও নিশুম্ভ স্বর্গ-মর্ত-পাতাল ত্রিলোকের অধীশ্বর। ইন্দ্র রাজ্যহীন। দেবতারা স্বর্গ থেকে বিতাড়িত। সূর্য, চন্দ্র, কুবের, বরুণ, অগ্নির জন্য যে কাজ নির্দিষ্ট, সেই কাজ করতে লাগল ওই দুই অসুর। পরাজিত, রাজ্যচ্যুত দেবতারা বিপদ থেকে বাঁচতে আদিশক্তি মহাদেবীকে স্মরণ করলেন। হিমালয় পর্বতে গিয়ে তাঁরা সমবেতভাবে সেই মহাশক্তির বিষ্ণুমায়াস্তব করতে লাগলেন। স্তবে তুষ্ট মহাদেবী দেবতাদের দেখা দিলেন। জিজ্ঞেস করলেন, তাঁরা কার স্তব করছেন? এই সময় মহাশক্তি পার্বতীর দেহ থেকে  আবির্ভূতা হলেন শিবা দেবী। উত্তর দিলেন, এঁরা শুম্ভ-নিশুম্ভের কাছে পরাজিত হয়ে বিপদ থেকে উদ্ধারের জন্য আমারই স্তব করছেন। এই দেবী ত্রিলোকে ‘কৌশিকী’ নামে পরিচিতি লাভ করলেন। ইনিই আবার মহাদেবী অম্বিকা। পার্বতীর দেহ থেকে কৌশিকী বা অম্বিকা সৃষ্টি হওয়ায় তিনি হয়ে গেলেন কৃষ্ণবর্ণের। তাই তাঁর আর এক নাম হল— ‘কালিকা’। ‘মার্কণ্ডেয়’ পুরাণে কালীর আবির্ভাব বিষয়ে দু’টি বর্ণনা আছে। এটিই হল সেই প্রথম বর্ণনা।

দ্বিতীয় বর্ণনাটি অনেকটা এরকম— দূতের মাধ্যমে মহাদেবীকে বিয়ের প্রস্তাব দিল শুম্ভ ও নিশুম্ভ। মা তাঁদের দূতকে বললেন, ‘আমি প্রতিজ্ঞা করেছি, যে ব্যক্তি আমার দর্প চূর্ণ করে যুদ্ধে পরাজিত করবে আমি তাঁকেই বিয়ে করব।’ এরপর আরও কিছু ঘটনার পর শুরু হল ঘোর যুদ্ধ। অসুর সেনাপতি ধূম্রলোচন গেল দেবীর সঙ্গে যুদ্ধ করতে। কিন্তু দেবীর ভয়ঙ্কর হুঙ্কারে সে তৎক্ষণাৎ পুড়ে ছাই হয়ে গেল। এই ঘটনায় ভীষণ রেগে গেল শুম্ভ-নিশুম্ভ। চণ্ড আর মুণ্ডকে শুম্ভ আদেশ দিল, দেবীকে চুলের মুঠি ধরে বেঁধে নিয়ে আসতে। অসুররাজের আদেশে চণ্ড-মুণ্ড গেল মহাদেবীকে দড়ি দিয়ে বেঁধে আনতে। অসুরদের স্পর্ধায় কুপিতা হলেন মা। তখন তাঁর কপাল থেকে বেরিয়ে এলেন এক কৃষ্ণবর্ণের দেবী। সেই দেবীর রূপ অতি ভয়ঙ্কর। তাঁর গলায় নরমালা, খট্বঙ্গধারিণী, রক্তমাখা অসি হাতে করাল বদনা। পরনে বাঘ ছাল। দেহের মাংস শুষ্ক। বিশাল বিস্তৃত মুখগহ্বরে জিভ লক লক করছে। চোখ রক্তবর্ণ। যেমন ভয়ঙ্কর রূপ, তেমনই তাঁর ভয়ঙ্কর হুঙ্কার। ত্রিভুবন কাঁপতে লাগল। অসুর সৈন্যসহ তাদের ঘোড়া, রথ, সারথিকে নাশ করলেন মহাদেবী। কোনও কোনও অসুর সৈন্যকে বধ করলেন নৃশংসভাবে। রণোন্মত্ত মহাদেবীর অট্টহাসিতে কাঁপতে লাগল অসুরদের হৃদয়। চুলের মুটি ধরে খড়্গ দিয়ে চণ্ডাসুরের মাথা কেটে ফেললেন তিনি। চণ্ডের পর দেবী প্রবলবেগে মুণ্ডের দিকে তেড়ে গেলেন। তাকেও তিনি খড়্গের আঘাতে ধরাশায়ী করলেন। তারপর অসুরনাশিনী মাকালী চণ্ড-মুণ্ডের কাটা মুণ্ড দু’টি নিয়ে দেবী কৌশিকীকে বললেন, মহাপশু চণ্ড-মুণ্ডের মাথা তোমায় উপহার দিলাম। তৃপ্ত মহাদেবী কালীকে বললেন, তোমার এই কাজের জন্য তুমি আজ থেকে ‘চামুণ্ডা’ নামেও কীর্তিত হবে। 

‘মার্কণ্ডেয়’ পুরাণ অনুসারে এই দুইভাবে কালীর সৃষ্টির কথা বলা হয়েছে। এছাড়াও বিভিন্ন শাস্ত্রে আলাদা আলাদাভাবে কালীর সৃষ্টি কথা বর্ণিত হয়েছে। 

যেমন— ‘অদ্ভুতরামায়ণে’ বলা হয়েছে, রাবণ বধের সময় সীতাদেবী কালীরূপ ধারণ করেছিলেন। আবার ‘কূর্মপুরাণ’, ‘বরাহপুরাণ’, ‘বামনপুরাণ’ অনুসারে, মেনকার গর্ভজাত উমা-পার্বতী আর কালী অভিন্ন। ‘নিরুত্তরতন্ত্র’, ‘চামুণ্ডাতন্ত্রাদি’, ‘শক্তিসঙ্গমতন্ত্র’, ‘মালিনীবিজয়’ প্রভৃতি শাস্ত্রেও কালী নামটি পাওয়া যায়। 

দক্ষরাজ এক মহাযজ্ঞের আয়োজন করেন। সেই যজ্ঞে ভগবান শিবকে চরম উপেক্ষা আর অবজ্ঞা দেখিয়ে নিমন্ত্রিতের তালিকা থেকে বাদ দেন দক্ষরাজ। তিনি চান শিবহীন যজ্ঞ করতে। তবুও সতী বা পার্বতী পিতার মহাযজ্ঞে যেতে চান। শিব তাঁকে নিষেধ করেন। কিন্তু মাতা পার্বতী গোঁ ধরেছেন দক্ষের মহাযজ্ঞে যাবেনই। তিনি তখন শিবকে মনে করিয়ে দেন যে, তিনিই সেই আদ্যাশক্তি। পার্বতী ছাড়া ব্রহ্ম কর্মক্ষমতাহীন-প্রাণহীন জড়। তিনিই মহাশক্তি মহামায়া। এই কথা বলে দেবী পার্বতী ভগবান শিবকে দেখালেন তাঁর দশমহাবিদ্যা রূপ। প্রথমে দেবীর শরীর থেকে সৃষ্টি হল এক ভীষণাকৃতির মূর্তি। এই অতিভীষণা ভয়ঙ্করীই হলেন মহাদেবী কালী। এই ঘটনায় শিবের মনেও ভয়ের উদয় হল। তিনি পালাতে গিয়ে দেখলেন তাঁকে ঘিরে দেবীর দশমহাবিদ্যার রূপগুলি অবস্থান করছেন। সামনে কালী, ঊর্ধ্বে তারা, পূর্বে ছিন্নমস্তা, পশ্চিমে ভুবনেশ্বরী, দক্ষিণে কালা, অগ্নি কোণে ধুমাবতী, নৈর্ঋত কোণে ত্রিপুরসুন্দরী, বায়ু কোণে মাতঙ্গী, ঈশান কোণে ষোড়শী আর অধঃদেশে ভৈরবী। এ কথার উল্লেখ রয়েছে ‘মহাভাগবত’ পুরাণে। 

কালী নামের একাধিক শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা আছে। সমগ্র জগৎ সংসারকে মহাদেবী মহাকালরূপে গ্রাস করেন। আবার মহাকালকেও আদ্যা কালিকারূপে তিনি গ্রাস করেন। মহাকালকে গ্রাস করেন বলেই তিনি ‘কালী’। জগৎ সৃষ্টির আদিরূপ আর ধ্বংসকালে সমগ্র বিশ্বকে তিনিই গ্রাস করেন। তাই তিনি আদ্যাশক্তি কালী। দেবী ভাগবতে আছে— কালান্তে সমগ্র ব্রহ্মাণ্ড যিনি গ্রাস করেন, তিনিই কালী। 

‘কালিকা’ শব্দের বর্ণবিশ্লেষণ অনুসারে তিনি ব্রহ্ম, অনন্ত, বিশ্বাত্মা, আর সূক্ষমা— ক্‌+আ+ল্‌+ই+ক্‌+আ। ক অর্থে ব্রহ্ম, আ অর্থে অনন্ত, ল অর্থে বিশ্বাত্মা আর ই অর্থে সূক্ষ্ম। 


কালী স্বরূপগতভাবে এক— আদ্যাশক্তি। প্রয়োজনে সাধকের অধিকার ও অভীষ্ট অনুসারে বিভিন্ন নামে আর রূপে প্রকাশিতা হন। বিভিন্ন তন্ত্রশাস্ত্রের মতে, কালী কোথাও নয়টি, কোথাও আটটি। ‘তোড়লতন্ত্র’ আর মহাকালসংহিতার অনুস্মৃতিপ্রকরণ— এই দুই শাস্ত্রেই প্রথম নামই দক্ষিণাকালীর। এছাড়াও রক্ষাকালী, সিদ্ধিকালিকা, গুহ্যকালিকা, ভদ্রকালী, শ্মশানকালী, চামুণ্ডাকালী প্রভৃতি আরও অনেক নামের কালী আছে। তন্ত্রশাস্ত্রে এইসব কালীর নাম, রূপ আর মাহাত্ম্যের উল্লেখ আছে। তন্ত্রশাস্ত্র মতে, রোগ, ব্যাধি, মহামারী, মড়ক, দুর্ভিক্ষে পীড়িত হলে শ্রদ্ধাভক্তিসহ রক্ষাকালীর পুজো করতে হয়। ভক্তবৎসল রক্ষাকালী মায়ের কৃপায় অকালমৃত্যুর ভয় থাকে না। দুর্ঘটনা, রোগ, মহামারী, মড়ক থেকে মানুষ উদ্ধার হয়। সর্বশত্রু নাশ আর ধর্ম-অর্থ-কাম-মোক্ষাদি চতুর্বর্গ ফল লাভের জন্য শ্মশানকালীর পুজো করা যেতে পারে। যে কোনও ভয়, উপদ্রব থেকে বাঁচতে আর বৈভব সিদ্ধির জন্য ভদ্রকালীর সাধনা করা উচিত। 

কালীর অনেক রূপ থাকলেও বাংলায় সর্বাধিক প্রচলিত রূপ হল দক্ষিণাকালী। গৃহী থেকে সন্ন্যাসী সকলেই দক্ষিণাকালীর পুজো করতে পারেন।

তাঁর এইরূপ নামের কারণ কী? শিবকে বলা হয় ‘দক্ষিণ’। শক্তি হলেন বামা। বামা দক্ষিণ বিজয় করে মহামোক্ষ প্রদান করেন। তাই তিনি দক্ষিণাকালী। শাস্ত্রের জটিলতা থেকে বেরিয়ে কালীর স্বরূপ-মাহাত্ম্যের অতি সরল ব্যাখ্যা দিয়ে গিয়েছেন স্বয়ং ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ। 

অক্টোবর মাস, ১৮৮২। দক্ষিণেশ্বর ছেড়ে একটি স্টিমার গঙ্গা দিয়ে কলকাতার দিকে যাচ্ছে। কেবিনের মধ্যে বিখ্যাত ব্রাহ্ম নেতা কেশবচন্দ্র সেন সহ আরও কয়েকজন গুণীজনের সঙ্গে মধ্যমণি হয়ে রয়েছেন ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ। কেশবচন্দ্র সেন বললেন, কালী কতভাবে লীলা করছেন সেই কথাগুলি একবার বলুন। 

ভগবান শ্রীরামকৃষ্ণ বলতে লাগলেন, তিনি নানাভাবে লীলা করছেন। তিনি মহাকালী, নিত্যকালী, শ্মশানকালী, রক্ষাকালী, শ্যামাকালী। 

মহাকালী, নিত্যকালীর কথা তন্ত্রে আছে। যখন সৃষ্টি হয়নি— চন্দ্র, সূর্য, গ্রহ, পৃথিবী ছিল না। নিবিড় আধার, তখন কেবল মহাকালের সঙ্গে বিরাজ করছিলেন মা নিরাকারা মহাকালী। 

শ্যামাকালী তাঁরই অনেকটা কোমল ভাব— বরাভয়দায়িনী। গৃহস্থ বাড়িতে তাঁরই পূজা হয়। যখন মহামারী, দুর্ভিক্ষ, ভূমিকম্প, অনাবৃষ্টি, অতিবৃষ্টি হয়— রক্ষাকালী পূজা করতে হয়। 

শ্মশানকালী সংহার মূর্তি। শব, শিবা, ডাকিনী, যোগিনী মধ্যে শ্মশানের উপর থাকেন। রুধিরধারা, গলায় মুণ্ডমালা, কটিতে নরহস্তের কোমরবন্ধ। যখন জগতে নাশ হয় মহাপ্রলয় হয়, তখন মা সৃষ্টির বীজ সকল কুড়িয়ে রাখেন।

এরপরই স্বভাবসিদ্ধ উপমায় বিষয়টি আরও সহজ করে পরমহংস বললেন, ‘গিন্নির কাছে যেমন একটা ন্যাতা-ক্যাতার হাঁড়ি থাকে, আর সেই হাঁড়িতে গিন্নি পাঁচরকম জিনিস তুলে রাখে।’

শ্রীরামকৃষ্ণ হাসতে হাসতে বলে চললেন, ‘হ্যাঁ গা! গিন্নিদের ওইরকম একটা হাঁড়ি থাকে। তারই ভিতরে সমুদ্রের ফেনা, নীল বড়ি, ছোট ছোট পুঁটলি বাঁধা শসাবিচি, কুমড়োবিচি, লাউবিচি— এইসব রাখে, দরকার হলে বের করে। মা ব্রহ্মময়ী সৃষ্টিনাশের পর ওইরকম সব বীজ কুড়িয়ে রাখেন। সৃষ্টির পর আদ্যাশক্তি জগতের ভিতরেই থাকেন! জগৎপ্রসব করেন, আবার জগতের মধ্যে থাকেন। বেদে আছে ঊর্ণনাভির কথা— মাকড়সা আর তার জাল। মাকড়সা ভিতর থেকে জাল বের করে আবার নিজে সেই জালের উপর থাকে। ঈশ্বর জগতের আধার আধেয় দুই।’ 

ভাবোন্মত্ত ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ যেন মহানির্বাণতন্ত্র। একে একে বলে চলেছেন শাস্ত্রের ভিতরের কথাগুলি— ‘কালী কী কালো? দূরে তাই কালো। জানতে পারলে কালো নয়। আকাশ দূর থেকে নীলবর্ণ। কাছে দেখ, কোনও রং নাই। সমুদ্রের জল দূর থেকে নীল, কাছে গিয়ে হাতে তুলে দেখ, কোন রং নাই।’ 

ঈশ্বরভাবের ঘোরে শ্রীরামকৃষ্ণের চোখের কোণে প্রেমাশ্রু, ঊর্ধ্বদৃষ্টি। তিনি গাইতে লাগলেন— 

‘মা কি আমার কালো রে।

কালোরূপ দিগম্বরী হৃদপদ্ম করে আলো রে।।’

চারযুগে দশমহাবিদ্যা ফল প্রদান করে। দশমহাবিদ্যার বিশিষ্ট তিন দেবী হলেন— কালী, তারা আর ত্রিপুরসুন্দরী। এই তিন মহাদেবীর মধ্যে একমাত্র মা কালীই হলেন কলিযুগের বিশিষ্ট আরাধ্যা আর প্রত্যক্ষ ফলদায়িনী। সুতরাং কলিকালে সর্বজীবের একমাত্র আশ্রয়স্থল মা কালী। ‘কলৌ কালী বিশিষ্যতে।’ 

ব্রহ্মা, বিষ্ণু, শিব, চন্দ্র, সূর্য, কুবের, অগ্নির মতো দেবতাদের পাশাপাশি বৃহস্পতি, দুর্বাসা, বশিষ্ঠ, দত্তাত্রেয় প্রমুখ মুনিঋষি ও গ্রহরাও কালীর উপাসক। তাঁরাও কালীকে পূর্ণরূপে জানতে পারেননি। ‘স্বল্পবুদ্ধি অল্পায়ু’ মানুষের ক্ষমতা কোথায় তাঁকে জানার! শুধু কাতর কণ্ঠে তাঁর কাছে প্রার্থনা, ‘তুমি সদা প্রসন্ন হও, অর্থ-ঐশ্বর্য-সুস্বাস্থ্য-সুমতি দাও। যাতে সারাটা বছর ভালো থাকি, শরণাগতির মন্ত্রে তোমার দু’টি রাঙা চরণে জানাই প্রণাম।’

No comments