কথা হলো বাতাসে উড়ে যাওয়া পালকের মতো— আশিস কুমার পণ্ডা
এক বৃদ্ধ একদিন তাঁর তরুণ প্রতিবেশী সম্পর্কে একটি গুজব ছড়িয়ে দিলেন যে ছেলেটি একজন চোর। ব্যাস, কথাটা আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ল। পাড়ায় পাড়ায় ফিসফিসানি শুরু হলো। পুলিশ এসে নি…
কথা হলো বাতাসে উড়ে যাওয়া পালকের মতো— আশিস কুমার পণ্ডা
এক বৃদ্ধ একদিন তাঁর তরুণ প্রতিবেশী সম্পর্কে একটি গুজব ছড়িয়ে দিলেন যে ছেলেটি একজন চোর। ব্যাস, কথাটা আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ল। পাড়ায় পাড়ায় ফিসফিসানি শুরু হলো। পুলিশ এসে নির্দোষ যুবকটিকে ধরেও নিয়ে গেল।
কয়েকদিন পর সত্যিটা সামনে এলো। প্রমাণ হলো, ছেলেটি সম্পূর্ণ নির্দোষ। তাকে ছেড়ে দেওয়া হলো।
কিন্তু ততদিনে অনেক ক্ষতি হয়ে গেছে। বাড়ি ফেরার পর তিনি দেখলেন, সবকিছু বদলে গেছে। হাতকড়া খুলে গেছে ঠিকই, কিন্তু মানুষের চোখে তিনি তখনও চোর। কেউ আর আগের মতো মেশেন না, সবাই আড়চোখে তাকান। তার সম্মানটা শেষ হয়ে গেছে।
অপমানিত ও কষ্ট পেয়ে যুবকটি বৃদ্ধের বিরুদ্ধে মামলা করলেন।
বিচারক জিজ্ঞাসা করলেন, "আপনি এমন কাজ কেন করলেন?"
বৃদ্ধ নির্বিকারভাবে উত্তর দিলেন, "আরে, ও তো এমনিই বলেছিলাম। কথার কথা। আমি তো কারো ক্ষতি করিনি।"
তখন বিচারক তাকে একটা শিক্ষা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। বললেন, "আপনি যা যা বলেছিলেন ওর সম্পর্কে, সব একটা কাগজে লিখুন। তারপর সেটা কুচি কুচি করে ছিঁড়ে ফেলুন। বাড়ি ফেরার পথে সেই টুকরোগুলো রাস্তায় ছড়াতে ছড়াতে যান। কাল সকালে এসে আপনার শাস্তি শুনবেন।"
বৃদ্ধ তাই করলেন।
পরের দিন তিনি আদালতে হাজির হলেন। বিচারক বললেন, "এবার একটা কাজ করুন। কাল যে কাগজের টুকরোগুলো ছড়িয়েছিলেন, সেগুলো সব কুড়িয়ে নিয়ে আসুন।"
বৃদ্ধ অবাক হয়ে বললেন, "এটা কী করে সম্ভব? হাওয়ায় সব উড়ে গেছে। কোথায় কোথায় গেছে আমি জানিই না।"
বিচারক মৃদু হেসে বললেন, “ঠিক তাই। কথাও ঠিক একই রকম। একবার মুখ থেকে বেরিয়ে গেলে, তাকে আর ফিরিয়ে আনা যায় না। হাওয়া যেমন কাগজকে সব জায়গায় ছড়িয়ে দেয়, তেমনি মানুষ কথাকে সব জায়গায় ছড়িয়ে দেয়। পরে সত্যিটা জানা গেলেও, যে ক্ষতি হওয়ার তা হয়েই যায়।"
এই শিক্ষাটা আজকের দিনে আরও বেশি দরকার।
আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যেখানে একটি মেসেজ, একটি স্ক্রিনশট বা একটি সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট এক সেকেন্ডেরও কম সময়ে হাজার হাজার মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। অনেকেই কোন তথ্য সত্যি কি না যাচাই না করেই গুজব, অনুমান বা অর্ধসত্য কথা অন্যের কাছে পৌঁছে দেন। অথচ একটি মিথ্যা অভিযোগ, একটি অসাবধানী মন্তব্য বা একটি যাচাই না করা খবর একজন মানুষের সুনাম, সম্পর্ক, কর্মজীবন এবং মানসিক শান্তি দীর্ঘদিনের জন্য নষ্ট করে দিতে পারে।
তাই কথা বলার আগে বা কিছু শেয়ার করার আগে নিজেকে তিনটি প্রশ্ন করুন—
· এটা কি সত্যি? আমি কি বিষয়টি যাচাই করেছি?
· এটা কি প্রয়োজনীয়? এটি বললে বা শেয়ার করলে কারও কোন উপকার হবে?
· এটা কি প্রীতিকর? যার সম্পর্কে বলছি, তিনি সামনে থাকলেও কি আমি একই কথা বলতাম?
এই তিনটির মধ্যে একটিরও উত্তর যদি “না” হয়, তাহলে সেটি না বলাই ভালো।
আজ নিজেকে একটি প্রতিশ্রুতি দিন।
গুজবের বাহক হবেন না। যদি কোন গুজব আপনার কানে আসে, সেটা আপনার কাছেই থামিয়ে দিন। সম্ভব হলে যে মানুষটি উপস্থিত নেই, তার পক্ষ নিন। সত্যকে গুরুত্ব দিন, অনুমানকে নয়। সহানুভূতিকে বেছে নিন, সমালোচনাকে নয়।
প্রতিটি গুজব কারও না কারও কাছে গিয়ে থামে। সেই মানুষটি আপনি হোন। কারণ অনেক সময় সবচেয়ে সুন্দর কথাগুলো হলো সেই কথাগুলো, যেগুলো আমরা আর কাউকে বলি না।

No comments