দুটি ছোট্ট প্রাণ আর কিছু পোকেমন কার্ড — আশিস কুমার পণ্ডা২০২১ সালে, ভার্জিনিয়ার একটি বাড়িতে ব্রুস নামে একটি আদুরে ল্যাব্রাডরের মিশ্র প্রজাতির কুকুরছানা আসে। পরিবারের সবার সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা তৈরি হলেও আট বছরের ব্রাইসনের সঙ্গে তার…
দুটি ছোট্ট প্রাণ আর কিছু পোকেমন কার্ড — আশিস কুমার পণ্ডা
২০২১ সালে, ভার্জিনিয়ার একটি বাড়িতে ব্রুস নামে একটি আদুরে ল্যাব্রাডরের মিশ্র প্রজাতির কুকুরছানা আসে। পরিবারের সবার সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা তৈরি হলেও আট বছরের ব্রাইসনের সঙ্গে তার বন্ধুত্ব ছিল একেবারে আলাদা। তারা শুধু একটি ছেলে আর তার পোষ্য কুকুর ছিল না; তারা ছিল একে অপরের অভিন্ন আত্মা।
ব্রাইসনের আরেকটি বড় ভালোবাসার জিনিস ছিল — পোকেমন কার্ড। প্রতিটি জন্মদিন, ক্রিসমাস বা বিশেষ অনুষ্ঠানে তার একটাই ইচ্ছা থাকত, আরও কার্ড পাওয়া। চার বছর ধরে সে শত শত কার্ডের এক চিত্তাকর্ষক সংগ্রহ গড়ে তুলেছিল। একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের কাছে সেগুলো হয়তো কয়েক টুকরো কার্ডবোর্ড ছাড়া আর কিছুই নয়। কিন্তু ব্রাইসনের কাছে সেগুলো ছিল অমূল্য সম্পদ। প্রিয় কুকুরছানা আর সাধের কার্ডের সংগ্রহ নিয়ে তার ছোট্ট পৃথিবীটা ছিল পরিপূর্ণ।
কিন্তু কয়েক মাস পরেই সবকিছু বদলে গেল।
কুকুরছানাটি ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ল। খেলাধুলা বন্ধ করে দিল। তার শারীরিক অবস্থার ক্রমশ অবনতি হতে লাগল। চিকিৎসক পরীক্ষা করে জানালেন, সে পারভোভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে। কুকুরের জন্য এই রোগ অত্যন্ত বিপজ্জনক এবং সময়মতো চিকিৎসা না হলে প্রাণঘাতীও হতে পারে। কিন্তু চিকিৎসার জন্য প্রয়োজন প্রায় ৭০০ ডলার—যা জোগাড় করা পরিবারের পক্ষে সম্ভব ছিল না।
কিন্তু ছোট্ট ব্রাইসন হাল ছাড়তে রাজি ছিল না। বাবা-মাকে না জানিয়ে সে একটি পরিকল্পনা করল। রাস্তার পাশে একটি ছোট টেবিল পেতে তার সাধের পোকেমন কার্ডের পুরো সংগ্রহটি বিক্রির জন্য সাজিয়ে দিল। পাশে একটি কাঠের সাইনবোর্ডে নিজের হাতে লিখে দিল, “Pokémon 4 SALE” (পোকেমন কার্ড বিক্রি আছে)।
নিজের সবচেয়ে প্রিয় সম্পদগুলির বিনিময়ে, সে বাঁচাতে চেয়েছিল তার সবচেয়ে প্রিয় প্রাণটিকে — যাকে সে তার নিঃশ্বাসের চেয়েও বেশি ভালোবাসতে শিখেছিল।
মা জানতে পেরে, ছেলেটিকে উত্সাহ দিতে এগিয়ে এলেন। তিনি টেবিলের পাশে বসে থাকা তার একটি ছবি তুলে স্থানীয় একটি ফেসবুক গ্রুপে পোস্ট করে দিলেন — এই আশায় যে কয়েকজন প্রতিবেশী হয়তো এসে কার্ড কিনবেন।
সত্যিই কয়েকজন এলেন।
দুদিনের মধ্যেই ব্রাইসন কয়েকশো ডলার সংগ্রহ করে ফেলল। কিন্তু তৃতীয় দিনে, এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটল।
কয়েকজন অপরিচিত মানুষ এলেন, কিন্তু কার্ড না কিনে তাঁরা নিজেদের সংগ্রহের কিছু পোকেমন কার্ড ব্রাইসনকে উপহার দিলেন। কেউ কেউ টেবিলের ওপর টাকা রেখে গেলেন, বিনিময়ে কার্ড নিলেন না। ব্রাইসনের ছবিটি ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন জায়গা থেকে সাহায্য আসতে শুরু করল। আট বছরের একটি শিশু ভালোবাসার জন্য কী ত্যাগ করতে পারে, তা সবাইকে অভিভূত করল। আর সেই ভালোবাসার টানে মানুষও স্বতঃস্ফূর্তভাবে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিল।
অল্প সময়ের মধ্যেই তহবিলে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক বেশি টাকা জমা হয়ে গেল। কুকুরটি প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পেল এবং প্রায় এক সপ্তাহ পরে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে এল। ব্রাইসন ফিরে পেল তার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধুকে। তার ছোট্ট পৃথিবীটা আবার আনন্দে ভরে উঠল।
কিন্তু গল্পের তখনও এক সুন্দর অধ্যায় বাকি ছিল।
ওয়াশিংটনের বেলভিউতে অবস্থিত পোকেমন কোম্পানি থেকে ব্রাইসনের বাড়িতে একটি প্যাকেজ এসে পৌঁছাল। ভিতরে ছিল তার অসাধারণ ভালোবাসা ও আত্মত্যাগের জন্য প্রশংসা ও ধন্যবাদ জানিয়ে লেখা একটি চিঠি, এবং কিছু দুর্লভ পোকেমন কার্ড — যাতে সে তার প্রিয় বন্ধুকে বাঁচাতে বিক্রি করে দেওয়া সংগ্রহটি আবার নতুন করে গড়ে তুলতে পারে।
তবে মানুষের ভালোবাসা সেখানেই থেমে থাকেনি।
তহবিলে প্রয়োজনের অতিরিক্ত যে টাকা জমা হয়েছিল, তা স্থানীয় পশু হাসপাতাল এবং আশ্রয়কেন্দ্রগুলিতে দান করা হল, যাতে অন্যান্য পরিবার যারা তাদের অসুস্থ পোষা প্রাণীর জীবন রক্ষাকারী চিকিৎসার খরচ বহন করতে পারে না, তাদের সাহায্য করা যায়।
কখনো কখনো সবচেয়ে ছোট হাতগুলোই আমাদের মানবিকতার সবচেয়ে বড় শিক্ষা দিয়ে যায়।
আমরা প্রায়ই নিজেদের বলি যে আমাদের কাছে যথেষ্ট টাকা, যথেষ্ট সময় বা যথেষ্ট সম্পদ থাকলে আমরা কাউকে সাহায্য করব। আমরা নিখুঁত মুহূর্তের জন্য অপেক্ষা করি, বিশ্বাস করি যে আমাদের অবদান খুব ছোট, কোন পার্থক্য তৈরি করবে না।
অথচ ব্রাইসনের বয়স ছিল মাত্র আট বছর। তার বিপুল সম্পদ ছিল না, প্রভাবশালী কারও সঙ্গে যোগাযোগ ছিল না, এমনকি কোন বিস্তৃত পরিকল্পনাও ছিল না। তার ছিল শুধু একটি টেবিল, বহু যত্নে গড়ে তোলা পোকেমন কার্ডের এক সংগ্রহ এবং তার প্রিয় সঙ্গীকে বাঁচানোর জন্য নিজের সবচেয়ে মূল্যবান জিনিসগুলি ত্যাগ করার মানসিকতা।
আর শেষ পর্যন্ত দেখা গেল, অসংখ্য হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়ার জন্য ওইটুকুই যথেষ্ট ছিল।

No comments