দুজন জুতোর সেলসম্যান — বাধা নাকি সুযোগ? — আশিস কুমার পণ্ডা
এক জুতো কোম্পানি তাদের ব্যবসা অন্য দেশের প্রত্যন্ত এক অঞ্চলে বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিল। বাজারের সম্ভাবনা যাচাই করার জন্য কোম্পানি সেখানে দুজন সেলসম্যানকে পাঠাল।কয়েক দিন পর, …
দুজন জুতোর সেলসম্যান — বাধা নাকি সুযোগ? — আশিস কুমার পণ্ডা
এক জুতো কোম্পানি তাদের ব্যবসা অন্য দেশের প্রত্যন্ত এক অঞ্চলে বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিল। বাজারের সম্ভাবনা যাচাই করার জন্য কোম্পানি সেখানে দুজন সেলসম্যানকে পাঠাল।
কয়েক দিন পর, প্রথম সেলসম্যান হেড অফিসে বার্তা পাঠাল: "অবস্থা খুব খারাপ। এখানে কেউ জুতো পরে না। কোন বাজারই নেই। আমি ফিরে আসছি।"
দ্বিতীয় সেলসম্যান তার রিপোর্ট পাঠালো: "অবস্থা দারুণ। এখানে কেউ জুতো পরে না। বিশাল সুযোগ আছে। যত দ্রুত সম্ভব বেশি জুতো পাঠান।"
দুজনেই একই জায়গায় গিয়েছিল।
দুজনেই একই মানুষদের দেখেছিল।
দুজনের কাছেই একই তথ্য ছিল।
তবুও তারা সম্পূর্ণ ভিন্ন সিদ্ধান্তে পৌঁছাল।
প্রথম সেলসম্যান খালি পা দেখে ভাবল, এখানে কখনো জুতো বিক্রি হবে না। কোন চেষ্টা করার আগেই সে ধরে নিল যে এই বাজারে ব্যবসার কোনো ভবিষ্যৎ নেই। তার কাছে গল্পটা সেখানেই শেষ হয়ে গিয়েছিল।
কিন্তু দ্বিতীয় সেলসম্যান একই দৃশ্য দেখে অন্যভাবে ভাবল। তার কাছে খালি পা মানে ছিল একটি বড় সুযোগ। সে বুঝল, এখানকার মানুষ এখনো জুতোর আরাম, সুরক্ষা ও সুবিধার সঙ্গে পরিচিত নয়। তাই খালি পা তার কাছে জুতোর প্রতি অনীহার প্রমাণ ছিল না; বরং ছিল নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত।
একজন দেখল কী নেই, আরেকজন দেখল কী হতে পারে।
একজন দেখল সমস্যা, আরেকজন দেখল সম্ভাবনা।
একজন দেখল বন্ধ দরজা, আরেকজন দেখল এমন একটি দরজা, যা এখনো খোলা হয়নি। পার্থক্যটা পরিস্থিতিতে ছিল না। পার্থক্যটা ছিল দৃষ্টিভঙ্গিতে।
আমাদের জীবনেও আমরা এমন পরিস্থিতিতে পড়ি যা কঠিন, হতাশার মনে হয়। সমস্যা দেখলেই আমরা বলে ফেলি — "এটা হবে না।" "কিছুই বদলাবে না।" "আমাদের পরিস্থিতি আলাদা।"
এই কথাগুলো শুনতে বাস্তব মনে হলেও, কিন্তু অনেক সময় এগুলোই আমাদের নিজের তৈরি সীমাবদ্ধতা হয়ে দাঁড়ায়। এগুলো আমাদের নতুন সম্ভাবনা খুঁজতে, সমাধানের পথ বের করতে এবং প্রথম পদক্ষেপ নিতে বাধা দেয়।
আসলে জীবনের অনেক পরিস্থিতি নিজের থেকে ভালো বা খারাপ হয় না। গুরুত্বপূর্ণ হলো আমরা সেগুলোকে কীভাবে দেখি। আমরা কি বাধা দেখছি, নাকি সুযোগ দেখছি? সমস্যা দেখছি, নাকি সম্ভাবনা?
ইতিবাচক মনোভাবের অর্থ এই নয় যে সমস্যাকে অস্বীকার করা নয়, বা বাস্তবতাকে এড়িয়ে যাওয়া নয়। বরং এর অর্থ হলো বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে তার মধ্যেই সম্ভাবনা খুঁজে বের করা।
"কেন এটা হবে না?" — এটা না বলে জিজ্ঞেস করুন, "এটা কীভাবে করা যায়?"
"কেউ কখনো এটা করেনি।" — এটা না বলে জিজ্ঞেস করুন, "আমি কি প্রথম শুরু করতে পারি?"
দ্বিতীয় সেলসম্যান একটা বড় সত্য বুঝেছিল — প্রতিটি সুযোগ প্রথমে সমস্যার ছদ্মবেশে আসে।
পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আবিষ্কার, ব্যবসা, সাফল্য শুরু হয়েছিল এমন সব চ্যালেঞ্জ থেকে, যাকে অন্যরা অসম্ভব ভেবেছিলেন। যারা সফল হয়েছিলেন, তারা বেশি বুদ্ধিমান বা ভাগ্যবান ছিলেন না; তারা শুধু সীমাবদ্ধতার জায়গায় সম্ভাবনা দেখতে বেছে নিয়েছিলেন।
দৃষ্টিভঙ্গির শক্তি বাধাকে সুযোগে, ব্যর্থতাকে শিক্ষায়, আর সাধারণ জীবনকে অসাধারণ জীবনে বদলে দিতে পারে।
মনে রাখবেন, পৃথিবী সব সময় আমাদের পছন্দের পরিস্থিতি দেবে না। কিন্তু প্রতিটি পরিস্থিতিতে কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাব, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ সব সময় আমাদের হাতে থাকে।
খালি পাকে হতাশা হিসেবে দেখা, নাকি বিশাল সুযোগ হিসেবে দেখা — এই পছন্দটা সবকিছু বদলে দিতে পারে। কারণ সাফল্য প্রায়ই শুরু হয় পরিস্থিতি বদলানো দিয়ে নয়, দৃষ্টিভঙ্গি বদলানো দিয়ে।

No comments