রান্নাপুজো বাংলায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে নানা লোকায়ত উৎসব। এই ভাদ্র মাস যখন শেষ হয়ে আসে তখন আমাদের সকলের একটা উৎসব মাথায় আসে। গ্রামবাংলায় প্রচলিত এই জনপ্রিয় উৎসবটা হল রান্নাপুজো!
এত কিছু দেবদেবীর পূজা শুনেছি, রান্না পুজো এ বড়…
রান্নাপুজো
বাংলায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে নানা লোকায়ত উৎসব। এই ভাদ্র মাস যখন শেষ হয়ে আসে তখন আমাদের সকলের একটা উৎসব মাথায় আসে। গ্রামবাংলায় প্রচলিত এই জনপ্রিয় উৎসবটা হল রান্নাপুজো!
এত কিছু দেবদেবীর পূজা শুনেছি, রান্না পুজো এ বড় অবাক করা বিষয়! আসলে এটা একটা বহু জনপ্রিয় একটা প্রথা। লোকায়ত প্রথাই। রান্না পুজো হলো ভাদ্র মাসের সংক্রান্তি অথবা তার আগের দিন প্রায় ১৯ রকম রান্না করে রাখা এবং তারপর দিন উনানে আগুন না ধরানো। অর্থাৎ খুব সংক্ষেপে একটা দিন উনুনের বিশ্রাম।
এখন উনুনের বিশ্রাম অর্থেই বাংলার আমাদের যারা গৃহিণীরা রয়েছেন মা-বোনেরা রয়েছেন তাদেরও একদিন বিশ্রাম। আমি হঠাৎ করে মা বোনেদের কথায় কেন বললাম? আসলে আমি যে সময়ের কথা বলতে চাইছি সেই সময়েও রান্নার কাজটা মূলত ঘরের মা-বোনেরাই করতেন। আজকের মত এরকম ব্যবস্থা ছিল না যেখানে সবাই মিলেমিশে কাজ করে। একটা সময় পর্যন্ত ঘরের মা-বোনেরাই এই হেঁশেল সামলেছেন। এমনও হয়েছে যে এই হেঁসলের বাইরে তারা বের হতে পারেননি। আবার এমন হয়েছে মশলা বাঁটতে গিয়ে হাত জ্বলে গেছে। এসব কথা তো আমরা কখনো ভেবেই দেখিনি। ভোজন রসিক বাঙালি শুধু ভোজনের কথা ভাবে কিন্তু সেই ভোজন কিভাবে তৈরি হয় সেই বিষয়ে তারা একটা সময় পর্যন্ত ভাবতো না। যার জন্য এই একটি দিন তাদের বিশ্রামের দিন ছিল।
অজস্র লোককথা এই রান্না পুজো ঘিরে আছে। তার মধ্যে একটা খুব জনপ্রিয় হলো এক সদাগরের সাত বৌমা ছিল, যারা একদিন পুকুরে স্নান করতে যায়। সেখানে ছিলেন অষ্টনাগ মাছের বেশে। তাদের মধ্যে ছোট বউ সেই মাছরুপী অষ্টনাগগুলোকে তুলে নেয়। ঘরে এনে তারপর সে হাঁড়িতে দেখে মাছ সাপ হয়ে গেছে। সেই ছোট বৌমা সেই সাপেদের খুব ভালো করে খেয়াল রাখে। যার জন্য সে মা মনসার কৃপাধন্য হয়। কিন্তু এই রকমই একদিন নারীদের জন্য দুধ গরম করতে গিয়ে অন্যমনস্ক হয়ে পড়ে। দুধ বেশি গরম হয়ে যায়। যার ফলে সেই দুধ পানে সাপেদের মুখ পুড়ে যায়। কিন্তু পরবর্তীতে সেই সাপেরা ছোট বউ এর ভুল বুঝতে পারে। অবশেষে মা মনসা এই ভাদ্র সংক্রান্তির সময়ে মা মনসার পূজা করার বিধান দেন। এবং বাসি রান্না খাওয়ার বিধান দেন। এর সাথে যোগ হয় পান্তা রান্না।
এখন বৈজ্ঞানিক দিক থেকে একটু ভাবার চেষ্টা করি। এই যে পান্তা রান্না হচ্ছে এটা কেনই খাওয়া হচ্ছে বাসি করে? একদম সরাসরি কারণটি হল পান্তা ভাতের হজম শক্তি বৃদ্ধিকারী গুণ আছে , এটা পেট ঠান্ডা করে । পান্তা ভাতের একটা রোগ প্রতিরোধকারী ক্ষমতা আছে। আর এই পান্তাভাতই এই অরন্ধনের সময় খাওয়া হচ্ছে যার ফলে মানুষের কল্যাণই হয়।
দ্বিতীয়তঃ এই ভাদ্র আশ্বিন এর সময়টা আবহাওয়া একটু ভিন্ন থাকে। আস্তে আস্তে সিজন চেঞ্জের সময় আসছে। তাই এই যাবতীয় যা রান্না হবে, যা খাওয়া হবে তা শরীরে ইমিউনিটি বৃদ্ধি করবে।
তৃতীয়ত গোটা শ্রাবণ ও ভাদ্র মাস জুড়ে যে মনসা পূজো হলো বা অষ্টনাগের পুজো হলো তার সমাপ্তি কিন্তু এই রান্না পুজো দিয়ে। এরপর হবে বিসর্জন।
চতুর্থত এই সময়টা সাপেদের উপদ্রব বৃদ্ধি পায় তাই মা মনসার আরাধনা করে তাকে সন্তুষ্ট রাখা যাতে সাপের বাড়বাড়ন্ত কমে যায়।
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে এটা হয়তো গল্পকথা হতে পারে কিন্তু আমার স্থির বিশ্বাস আজকেও গ্রাম বাংলার বহু জায়গায় এই রান্না পুজো হয়। যে মা ঠাকুমারা এই প্রথা পালন করে আসতেন আজ হয়তো তারা নেই কিন্তু তাদের সেই প্রথা এখনো মুছে যায়নি। তাই হয়তো কোথাও না কোথাও এভাবেই রান্না পুজো হচ্ছে উনুনে ফণিমনসার ডাল পুঁতে প্রতীকী পূজা।
খাবার মধ্যে থাকবে পান্তা ভাত মুগের ডাল, কচু শাক, লতি চচ্চড়ি, পাঁচ রকম ভাজা। আলু কুমড়ো নারকেল দিয়ে ছাচি, জোড়া ইলিশের পাতলা ঝোল ভাপা ইলিশ আর চালতার টক।
মা বিষহরি কিন্তু এখানে উনুনেই প্রতীকী। সেই উনুন যা বাংলার বহু মা-ঠাকুমার জীবনসংগ্রামের সাক্ষী। মা বিষহরিও নিজেও সংগ্রামের সম্মুখীন হয়েছেন। কোথাও গিয়ে সব এক হয়ে যায়!
তাই আজকের রান্নাপুজো শুধু পুজো করতে হয় বলে করবো না, এটাও আসলে আমাদের মা-ঠাকুমাদের শ্রদ্ধাজ্ঞাপন। যদি হেঁসেলের কাজ আজকের মত তুলনামূলক সহজ হত, তাহলে আজ তাদের মধ্য থেকেও উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক বেরিয়ে আসত, ইতিহাসে লেখা থাকত। তাই কেউ মনে রাখুক না রাখুক, আমি এখনো মনে রাখি সেই পুরোনো মা-ঠাকুমাদের, যারা শুধু আমরা ভালো থাকবো বলে নিজের দিকে তাকাননি।
আমি জানি তোমরা এখনো আমাদের চারপাশে আছো, হয়তো স্নেহের পরশ দিয়ে পারো না। কিন্তু সে স্পর্শ উপলব্ধি করি! সবকিছুর জন্য আমাদের ক্ষমা কোরো!
জয় মা বিষহরি! ওদেরকে ভালো রেখো!
© Krishnendu Mondal ( ছবি ও লেখা ) সংগৃহীত পোস্ট 🙏 #everyone #festival #fb #fbpost #goodvibes
No comments