বিয়ের হিসাব: অতিথি: ৫০০, সাক্ষী: ০ — আশিস কুমার পন্ডা
আপনি যদি আপনার বিয়েতে ৫০০ জনকে নিমন্ত্রণ করেন, মেনে নিতে কষ্ট হলেও, এটাই বাস্তব যে বেশিরভাগ মানুষ আপনার গল্প মনে রাখবেন না। তারা আপনাকে ভালোবাসেন না, তা নয়। কিন্তু তারা মানুষ…
বিয়ের হিসাব: অতিথি: ৫০০, সাক্ষী: ০ — আশিস কুমার পন্ডা
আপনি যদি আপনার বিয়েতে ৫০০ জনকে নিমন্ত্রণ করেন, মেনে নিতে কষ্ট হলেও, এটাই বাস্তব যে বেশিরভাগ মানুষ আপনার গল্প মনে রাখবেন না। তারা আপনাকে ভালোবাসেন না, তা নয়। কিন্তু তারা মানুষ—তাই, এটাই স্বাভাবিক।
তারা মনে রাখবেন বিরিয়ানি মুখোরোচক হয়েছিল। তারা মনে রাখবেন ডিজে জোরে বেজেছিল। তারা মনে রাখবেন সোনালি মণ্ডপ। তারা মনে রাখবেন আপনার লাল শাড়ি। তারা মনে রাখবেন ফুলের পাশে তোলা নিজস্বী (Selfie)।
কিন্তু ছোট ছোট জিনিসগুলো? : —
অনেক কিছুই আপনার দু’জনের কাছে থাকে—তাদের কাছে নয়। যে বড় ঝগড়াটা প্রায় ভেঙে দিচ্ছিল সবকিছু। যে গভীর রাতে ফোনে কথা বলে সম্পর্কটা বাঁচিয়েছিলেন। সেই গান, সেই প্রতিশ্রুতি।
মানুষ কেন ভুলে যান? : —
বিজ্ঞান আর বাস্তব জীবন—দুটোই বলে, মানুষের মনোযোগের একটা সীমা আছে। বিয়ের দিনে তাদের মন অনেক দিকে ছুটে যায়। তারা কথা বলেন, তুলনা করেন, ছবি তোলেন, সোশ্যাল মিডিয়ায় দেন, বাচ্চাদের সামলান, সময় দেখেন। তারা আসেন, কারণ তারা আপনাকে ভালোবাসেন—অনেকে আসেন, কারণ তারা আসা দরকার বলে মনে করেন।
সেদিন আপনি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ—তবুও আপনাকে সহজেই বাদ দেওয়া যায়। আপনি লাখ লাখ টাকা খরচ করেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত উপেক্ষিতই থেকে যান।
ছাদ ছোঁয়া মঞ্চ। ১২ রকম স্টার্টার, যা অনেকে শুরু করেন কিন্তু কেউ শেষ করেন না। এত আলো, যে চোখ ধাঁধিয়ে যায়। সবকিছু—মাত্র ৬ ঘণ্টার জন্য। অনেকেই পরের দিনই ভুলে যাবেন। অপচয় শুধু খাবারে নয়—অনুভূতিতেও। ৩০–৪০% খাবার ফেলে দেওয়া হয়। অনেক কথাই মানুষ বাড়ি পৌঁছানোর আগেই ভুলে যাবেন। ৫০০ জনকে খুশি করতে গিয়ে, দিনটার আসল কারণটাই বদলে যায়।
সংখ্যা মানেই ভালো নয়: —
মার্কেটিং, অনুষ্ঠান, সামাজিক মাধ্যমে এই ধাঁধাকে বলা যায়: দর্শক ভ্রম, বা ভিড়ের ধাঁধা, বা সংখ্যার মোহ। মানে, আমরা ভাবি—যত বেশি মানুষ, তত বেশি গুরুত্ব। লাইক যত বেশি, কাজ তত সফল। অতিথি যত বেশি, অনুষ্ঠান তত সফল। কিন্তু আসলে তা নয়। ভিড় বাড়ে, গভীরতা বাড়ে না। ছবি বাড়ে, সাক্ষী বাড়ে না। খরচ বাড়ে, মান বাড়ে না। আসল কথা ভিড় মানে গুরুত্ব নয়, লাইক মানে ভালোবাসা নয়, অতিথি মানে সাক্ষী নয়।
একবার ভাবুন: —
যদি মঞ্চ না থাকে, ফ্রি ড্রিঙ্কস না থাকে, ক্যামেরা না থাকে—তাহলে কে আসবেন? কে মেঝেতে বসে আপনার সঙ্গে ডাল-ভাত খাবেন, আর আপনার কাহিনী শুনে চোখের জল ফেলবেন? যারা আসবেন তারাই আপনার আসল অতিথি। বাকিরা শুধু দর্শক।
কয়েকটি প্রশ্ন: —
v বিয়ের আকারটাই আসল নয়। বরং নিজেকে জিজ্ঞাসা করুন— এটা কার জন্য? আপনার গল্প, না অন্যদের তালিকা?
v আপনি কি এমন কিছু বানাচ্ছেন, যা নিজের কাছে থাকবে? নাকি দেখানোর জন্য?
v এটা কি আপনার শান্তির জন্য? নাকি অন্যদের হাততালির জন্য?
অনুষ্ঠানের মধ্যে হাততালি জোরে হয়—কিন্তু অনুষ্ঠান শেষ হলেই থেমে যায়। কিন্তু সত্যিকারের অনুভূতি চুপচাপ থেকে যায় অনেকদিন।
এরপর কী হয়: —
পরের দিন—মণ্ডপ নেই। বড় মেনু নেই। আবার স্বাভাবিক খাবারেই ফিরে আসা। কতজন এসেছিলেন—তা আপনি মনে রাখবেন না। যা মনে থাকবে, তা খুব ছোট, কিন্তু খুব পরিষ্কার— অনুষ্ঠানের আগে, যখন কেউ দেখেননি—আপনার সঙ্গী আপনাকে যেভাবে দেখছিল। বন্ধুর সাথে সেই কথাটা, যেটা বিয়ে নিয়ে নয়, জীবন নিয়ে। সবাই চলে যাওয়ার পরের সেই ১০ মিনিট—যখন দিনটা সত্যিই আপনার মনে হয়েছিল। এর জন্য ৫০০ জনের দরকার নেই। দরকার সঠিক মানুষ। আর একটু নীরবতা—যাতে আপনি তাদের সত্যিই দেখতে পারেন।
তাই পরিকল্পনা করুন তাদের জন্য—যারা ফুল শুকিয়ে যাওয়ার পরও আপনার জীবনে থাকবে। আর যখন সবাই চলে যাবেন—যে সঙ্গী আপনার সাথে থাকবেন, তার জন্যে। কারণ, বিয়ে এক দিনের হলেও প্রতিশ্রুতি বাকি জীবনের।

No comments