Page Nav

HIDE

Grid Style

GRID_STYLE

Post/Page

Weather Location

Breaking News:

latest

কৃষ্ণ বনাম নারায়ণী সেনা— গুণমান বনাম পরিমাণ: আশিস কুমার পন্ডা

কৃষ্ণ বনাম নারায়ণী সেনা— গুণমান বনাম পরিমাণ: আশিস কুমার পন্ডা
কুরুক্ষেত্রের মাটিতে যুদ্ধের হাওয়া বইতে শুরু করেছে। পাণ্ডব আর কৌরবদের মধ্যে টানাপোড়েন চরমে পৌঁছেছে। সবাই বুঝে গেছেন—বিরোধ আর কথায় মিটবে না, যুদ্ধ হবেই। কিন্তু যুদ্ধ…

 




কৃষ্ণ বনাম নারায়ণী সেনা— গুণমান বনাম পরিমাণ: আশিস কুমার পন্ডা


কুরুক্ষেত্রের মাটিতে যুদ্ধের হাওয়া বইতে শুরু করেছে। পাণ্ডব আর কৌরবদের মধ্যে টানাপোড়েন চরমে পৌঁছেছে। সবাই বুঝে গেছেন—বিরোধ আর কথায় মিটবে না, যুদ্ধ হবেই। কিন্তু যুদ্ধের আগে দরকার মিত্রশক্তি। আর এমন একজন বাকি আছেন, যার সমর্থন সবকিছু বদলে দিতে পারে—তিনি হলেন দ্বারকাধীশ কৃষ্ণ।

কৌরবদের পক্ষ থেকে দুর্যোধন, আর পাণ্ডবদের পক্ষ থেকে অর্জুন —দু’জন রওনা দিলেন দ্বারকার দিকে। আত্মবিশ্বাসে ভরা দুর্যোধন আগে পৌঁছলেন। কৃষ্ণের কক্ষে প্রবেশ করে তিনি দেখলেন, কৃষ্ণ তখন যোগনিদ্রায় বিশ্রাম নিচ্ছেন। রাজকীয় অহংকারে তিনি কৃষ্ণের মাথার পাশে বসে পড়লেন। অর্জুন এলেন কিছুক্ষণ পরে, কৃষ্ণকে বিশ্রাম নিতে দেখে তিনি বিনম্রভাবে হাত জোড় করে কৃষ্ণের পায়ের কাছে দাঁড়িয়ে রইলেন।

ঘর নিঃশব্দ… ভাগ্য নির্ধারণের মুহূর্তের জন্যে কৃরুপাণ্ডবের দুই বীর অপেক্ষা করছেন।

কিছুক্ষণ পরে কৃষ্ণের যোগনিদ্রা শেষ হল। চোখ খুলতেই স্বভাবতই তার পায়ের দিকে নজর পড়লো। অর্জুনকে দেখে তিনি মৃদু হাসলেন। অর্জুন দু’হাত জড়ো করে প্রণাম জানাতেই তিনি হেসে বললেন, “অর্জুন… তুমি এখানে!”

দুর্যোধন সঙ্গে সঙ্গে এগিয়ে এসে বললেন, “বাসুদেব! আমি প্রথমে এসেছি। তাই অর্জুনের সঙ্গে কথা বলার আগে আমার সঙ্গেই কথা বলা উচিত।”

কৃষ্ণ শান্তভাবে বললেন, “হ্যাঁ, তুমি আগে এসেছো। কিন্তু আমি প্রথমে অর্জুনকেই দেখেছি।”

কৃষ্ণ বললেন, “তোমরা দু’জনেই আমার সাহায্য চাইতে এসেছো। আমি কাউকেই ফিরিয়ে দেব না। একদিকে থাকবে আমার এগারো অক্ষৌহিণী নারায়ণী সেনা—এক বিশাল শক্তিশালী বাহিনী। আর অন্যদিকে থাকব আমি—একাই। তবে, আমি কোন অস্ত্র ধরব না, যুদ্ধও করব না।” তোমাদের যে কোন একটি বিকল্প পছন্দ করতে হবে।”

ঘরের পরিবেশ আরও গম্ভীর হয়ে উঠল।

কৃষ্ণ আবার বললেন,“দুটি কারণে অর্জুন আগে বেছে নেওয়ার সুযোগ পাবে। আমি চোখ খুলে প্রথমে তাকে দেখেছি, কারণ সে আমার পায়ের কাছে ছিল। আর দ্বিতীয়ত, সে তোমাদের দু’জনের মধ্যে ছোট।”

দুর্যোধন রেগে গেলেও চুপ করে রইলেন।

কৃষ্ণ অর্জুনকে বললেন, “বল পার্থ, তুমি কী চাও?”

অর্জুন একটুও দেরি না করে মাথা নত করে বলল,“প্রভু, আমি আপনাকেই চাই।”

দুর্যোধনের মুখে চাপা আনন্দ ফুটে উঠল। ভাবলেন, অর্জুন কত বড় মূর্খ! পুরো সেনা ছেড়ে একজন মানুষকে বেছে নিল, যিনি যুদ্ধই করবেন না!

কৃষ্ণ হেসে অর্জুনকে বললেন, “আমি তো যুদ্ধ করব না, তাহলে আমাকে নিয়ে তুমি কী করবে?”

অর্জুন শান্তভাবে বললেন, “প্রভু, আপনার উপস্থিতিই যথেষ্ট। যেখানে আপনি আছেন, সেখানে ধর্ম আছে। আর যেখানে ধর্ম আছে, সেখানেই জয় আছে।”

এবার দুর্যোধনের পালা। তিনি খুশি লুকাতে না পেরে বললেন, “তাহলে আমি নারায়ণী সেনাকেই নেব।” তার মনে তখন জয়ের আনন্দ। তিনি বিশ্বাস করতেন—বিশাল সেনা মানেই জয়। তিনি বীরদর্পে সেখান থেকে চলে গেলেন।

কৃষ্ণ গভীরভাবে অর্জুনের দিকে তাকালেন, তার চোখে আনন্দ ঝলকে উঠলো। এই এক সিদ্ধান্ত যেন যুদ্ধের ফলাফল ঘোষণা করে দিল। অর্জুন কৃষ্ণকে প্রণাম জানিয়ে বিদায় নিলেন।

অর্জুন বেছে নিলেন জ্ঞান। দুর্যোধন বেছে নিলেন শক্তি।

অর্জুন বিশ্বাস করলেন গুণগত মান-এ (Quality)। দুর্যোধন বিশ্বাস করলেন সংখ্যায় বা পরিমাণে (Quantity)।

অর্জুন ভরসা করলেন সঠিক পথপ্রদর্শককে। দুর্যোধন ভরসা করলেন বাহিনীতে।

ইতিহাস পরে প্রমাণ করেছে—

শক্তি কেবল তখনই কার্যকর হয় যখন তার পিছনে শুভ বুদ্ধি থাকে। সংখ্যা দিয়ে যুদ্ধ জয় করা যায় না, জয় আসে সঠিক পথপ্রদর্শকের দেওয়া মহত উদ্দেশ্য থেকে। নারায়ণী সেনা ছিল অগাধ শক্তির উত্স, কিন্তু দুর্যোধন ছিলেন অধর্মের প্রতীক, যার সুনির্দিষ্ট কোন লক্ষ্য বা ধর্ম ছিল না। তাই ধর্ম-অধর্ম, প্রতিশ্রুতি, কর্তব্যের টানাপোড়েনে মাত্র এক অক্ষৌহিণী নারায়নী সেনা কৌরবপক্ষের হয়ে লড়াই করার জন্যে রাজি হয়েছিলেন, কিন্তু কৃষ্ণের দিশা নির্দেশের অভাবে, তারা প্রায় সকলেই বীরগতি প্রাপ্ত হয়েছিলেন।

অনেক সময় জীবন আমাদের এমন এক মোড়ে দাঁড় করিয়ে দেয়—যেখানে সামনে শুধু দুটি পথ—যার একদিকে থাকে সফলতার প্রলোভন আর অন্যদিকে থাকে বিফলতার আশঙ্কা।

এক দিকে শক্তি—দৃশ্যমান, চমকপ্রদ। অন্য দিকে জ্ঞান—নীরব, গভীর, অদৃশ্য।

এক দিকে সংখ্যা—ভিড়, সমর্থন। অন্য দিকে দিশা—একটি কণ্ঠ, কিন্তু সঠিক পথ।

এক দিকে অহংকার, অন্য দিকে বিনয়।

সেই মুহূর্তে কোন তলোয়ার ঝনঝন করে না, কোন যুদ্ধও শুরু হয় না। তবুও সেখানেই নির্ধারিত হয়ে যায় আগামী যুদ্ধ বা পরীক্ষার ফলাফল। কিন্ত, সেই মূহুর্তে অর্জুনের মত যারা সঠিক পথ এবং সঠিক পথপ্রদর্শককে বেছে নেন, জয় তাদেরই হয়। শক্তির চেয়ে বড় হল সেই শক্তিকে চালনা করার সঠিক পথপ্রদর্শক ও দর্শন।

No comments