বহুরূপী: আশিস কুমার পন্ডা
বার্ষিক বিজ্ঞান প্রদর্শনীর দিনে স্কুলের এক শ্রেণিকক্ষে খুব হৈচৈ চলছিল। চারদিকে উত্তেজনা আর কৌতূহলের পরিবেশ। কেউ আগ্নেয়গিরির মডেল দেখাচ্ছে, কেউ মহাকাশ, কেউ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, আবার কেউ রোবট ও রঙিন চার্ট …
বহুরূপী: আশিস কুমার পন্ডা
বার্ষিক বিজ্ঞান প্রদর্শনীর দিনে স্কুলের এক শ্রেণিকক্ষে খুব হৈচৈ চলছিল। চারদিকে উত্তেজনা আর কৌতূহলের পরিবেশ। কেউ আগ্নেয়গিরির মডেল দেখাচ্ছে, কেউ মহাকাশ, কেউ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, আবার কেউ রোবট ও রঙিন চার্ট নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। শিক্ষক ও দর্শনার্থীরা ঘুরে ঘুরে সবকিছু দেখছেন, প্রশ্ন করছেন। হাসি, কথা আর হাততালিতে পুরো ঘরটা যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছিল।
এইসব ভিড় আর কোলাহলের মাঝেই এক কোণে রাখা একটি ছোট টেবিল সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করছিল। টেবিলের ওপর একটি সাইনবোর্ডে বড় করে লেখা—
“সতর্কতা: এই পদার্থটি দেখতে সাধারণ, কিন্তু অত্যন্ত বিপজ্জনক।”
টেবিলের ওপর একটি কাঁচের কোনিকাল ফ্লাস্কে স্বচ্ছ, বর্ণহীন একটি তরল রাখা ছিল। কয়েকজন ছাত্র কৌতূহল নিয়ে জড়ো হল।
“এটা কী?”
“এটা কি কোনো অ্যাসিড?”
“এত বিপজ্জনক কেন?”
টেবিলের ওপারে দাঁড়িয়ে ছিল এক ছাত্র—অজয়। সে শান্ত ও আত্মবিশ্বাসীভাবে বলল, “এই পদার্থটি দেখতে খুব সাধারণ, কিন্তু এটি পৃথিবীর অন্যতম বিপজ্জনক পদার্থ। এটি পোড়াতে পারে, এটি মানুষকে মারতেও পারে, আর বেশি পরিমাণে নিলে এটি বিষের মতো কাজ করতে পারে।”
ছাত্রদের মধ্যে সঙ্গে সঙ্গে চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ল। কেউ একটু পিছিয়ে গেল, কেউ আবার আরও কাছে এগিয়ে এল।
“পোড়াতে পারে? মারতে পারে?”
“এটা কি অ্যাসিড না ক্ষার?”
“নাকি কোনো নতুন ধরনের বিপজ্জনক রাসায়নিক?”
“এটা কি অন্য কোনো গ্রহ থেকে এসেছে?”
অজয় রহস্যময় ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে বলল, “হ্যাঁ, এই পদার্থ অনেক মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়েছে। এটি ধীরে বা দ্রুত জীবন নষ্ট করতে পারে। এটি সর্বত্র আছে—নদী, সমুদ্র, পাহাড়, আগ্নেয়গিরি, এমনকি আমাদের শরীরের মধ্যেও।”
সে আরও বলল, “কঠিন অবস্থায় এটি খুব ঠান্ডা ও শক্ত হয়ে যায়। তখন মানুষ এতে পা পিছলে পড়ে গিয়ে আঘাত পেতে পারে। অনেকক্ষণ স্পর্শ করলে ত্বকের ক্ষতি হয়। বেশি ঠান্ডায় শরীরের তাপমাত্রা কমে গিয়ে বিপদও হতে পারে। গ্যাস অবস্থায় এটি অদৃশ্য ও খুব গরম হয়ে যায়, যা সহজেই পোড়াতে পারে। তরল অবস্থায়, দেখতে নিরীহ হলেও, বেশি পরিমাণে নিলে এটি জীবননাশের কারণ হতে পারে।”
ধীরে ধীরে পুরো ঘরটা চুপ হয়ে গেল।
এবার শ্রেণিশিক্ষক এগিয়ে এসে বললেন, “অজয়, এবার পরিষ্কার করে বলো তো—এটা আসলে কী?”
অজয় একটু থেমে মুচকি হেসে বলল,
“এর নাম অক্সিডেন—এটাই এর বৈজ্ঞানিক নাম।”
ঘরটা একেবারে নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
“একে আবার ডাইহাইড্রোজেন মনোক্সাইডও বলা হয়—মানে দুইটি হাইড্রোজেন আর একটি অক্সিজেনের মিলনে তৈরি।”
কিছু ছাত্র অবাক হয়ে একে অপরের দিকে তাকাল।
“এছাড়াও একে হাইড্রোক্সিলিক অ্যাসিড বলা হয়—কারণ এটি খুব দুর্বল অ্যাসিডের মতো আচরণ করতে পারে। আর কিছু পুরনো বইয়ে একে হাইড্রল নামেও ডাকা হয়।”
সবাই নিঃশ্বাস বন্ধ করে শুনছিল।
অজয় ধীরে ধীরে ফ্লাস্কটির দিকে ইশারা করে বলল,
“এই সব নাম… এই সব পরিচয়… আসলে একই পদার্থকে বোঝায়।”
এক মুহূর্ত নীরবতা।
তারপর সে বলল, “এটা… আসলে জল—H₂O।”
সবাই একসঙ্গে হেসে উঠল।
কেউ বলল, “জল তো জীবনের জন্য দরকার!”
অজয় মাথা নেড়ে বলল, “হ্যাঁ, ঠিকই। কিন্তু ভাবো—যা আমাদের জীবন দেয়, সেটাই আবার অসাবধান হলে জীবন নিতে পারে। আসলে বিপদ পদার্থে নয়, আমরা সেটাকে কীভাবে ব্যবহার করি, সেটাই আসল কথা।”
শিক্ষক হাসিমুখে বললেন,“আজ তুমি খুব সুন্দর একটি শিক্ষা দিলে।”
অজয় শেষে বলল, “এই পৃথিবীতে কিছুই পুরোপুরি নিরাপদ বা পুরোপুরি বিপজ্জনক নয়। সবকিছু নির্ভর করে আমাদের সচেতনতা, ভারসাম্য আর ব্যবহার করার ওপর।”
সেদিনের পর থেকে, সাধারণ জল আর তাদের কাছে আগের মতো সাধারণ থাকেনি।

No comments