Page Nav

HIDE

Grid Style

GRID_STYLE

Post/Page

Weather Location

Breaking News:

latest

তিনটি গাছের গল্প: আশিস কুমার পন্ডা

তিনটি গাছের গল্প: আশিস কুমার পন্ডাএক ঐতিহ্যবাহী  প্রাচীন লোককথা:অনেক, অনেক দিন আগে, এক পাহাড়ের চূড়ায় তিনটি ছোট গাছ একসঙ্গে বেড়ে উঠছিল। একদিন তারা তাদের আশা ও স্বপ্ন নিয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছিল— বড় হয়ে তারা কী হতে চায়।
প…

 



তিনটি গাছের গল্প: আশিস কুমার পন্ডা

এক ঐতিহ্যবাহী  প্রাচীন লোককথা:

অনেক, অনেক দিন আগে, এক পাহাড়ের চূড়ায় তিনটি ছোট গাছ একসঙ্গে বেড়ে উঠছিল। একদিন তারা তাদের আশা ও স্বপ্ন নিয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছিল— বড় হয়ে তারা কী হতে চায়।


প্রথম গাছটি সন্ধ্যার আকাশে হীরার মতো ঝকঝকে তারাদের দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো, "আমি হব বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর ধনরত্নের এক সিন্দুক! আমার ভিতরে থাকবে অজস্র সোনা, রূপা আর দামি মনি মানিক্য! আমার উপরে ফুটিয়ে তোলা হবে অসামান্য কারুকার্য্য এবং বসানো থাকবে চকচকে রংবেরঙ্গের পাথর। সবাই আমার সৌন্দর্য দেখে প্রশংসা করবে!"


দ্বিতীয় গাছটি সমুদ্রের দিকে এগিয়ে চলা এক খরস্রোতা পাহাড়ি নদীর দিকে তাকিয়ে বলল, "আমি বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী জাহাজ হব! দুরন্ত সাগর পাড়ি দিয়ে, সম্ভ্রান্ত রাজা রানীদের পৃথিবীর সুদূর কোণে পৌঁছে দেব। আমার মজবুত খোলের মধ্যে তারা সবাই নিশ্চিন্তে থাকতে পারবেন।


তৃতীয় গাছটি নীচের উপত্যকার দিকে তাকাল, সেখানকার ব্যস্ত শহরে অনেক পুরুষ এবং মহিলা বাস করতেন। সে বলল, "আমি পাহাড়ের চূড়া ছেড়ে অন্য কোথাও যেতে চাই না এবং এত সোজা ও লম্বা হতে চাই যে পাহাড়ের নীচের মানুষেরা যখন আমার দিকে তাকাবেন, তখন তারা স্বর্গের দিকে চোখ তুলে ঈশ্বরের কথা ভাববেন। আমি পৃথিবীর সবচেয়ে লম্বা গাছ হব।"


গ্রীষ্মের তাপ, বর্ষার জল, শীতের শিশির মেখে গাছগুলি সুন্দর, শক্ত ও লম্বা হতে লাগল। কয়েক বছর এইভাবে তাদের প্রার্থনা ও স্বপ্ন নিয়ে বেঁচে থাকার পরে, একদল কাঠুরিয়া তাদের কাছে এসে দাঁড়ালেন। চকচকে কুড়ালের আঘাতে, কিছুক্ষণের মধ্যেই গাছ তিনটি ধরাশায়ী হয়ে গেল। প্রথম গাছটিকে একটি ছুতারের দোকানে আনা হল এবং গবাদী পশুদের খাবার রাখার জন্য একটি বাক্স তৈরি করা হল। দ্বিতীয় গাছটিকে একটি জাহাজ তৈরির কারখানায় নিয়ে গিয়ে একটি ছোট মাছ ধরার নৌকা বানানো হলো। তৃতীয় গাছটি একেবারে ভেঙে পড়ল। তার শক্ত শরীর ফালা-ফালা করে কেটে কয়েকটি কড়িকাঠ (বিম) বানিয়ে ভবিষ্যতে ব্যবহারের জন্য একটি অন্ধকার গুদামে রাখা হল। সে ব্যথাভরা কণ্ঠে বলল, ‘আমার সঙ্গে কেন এমন পরিহাস করা হল? আমার তো স্বপ্ন ছিল পাহাড়ের উপরে দাঁড়িয়ে মানুষকে ভগবানের কথা মনে করাব!


প্রথম গাছটির উপরে না তো ফুটিয়ে তোলা হল অসামান্য কারুকার্য্য,  না তাকে ধন রত্ন দিয়ে ভরে দেওয়া হল! তাকে এক আস্তাবলে রেখে দেওয়া  হলো আর ক্ষুধার্ত গবাদী পশুদের খাওয়ার জন্যে খড়-কুটা দিয়ে ভর্তি করে দেওয়া হলো। তার উপরে খড়ের মোটা ধুলোর প্রলেপ জমে গেল। দ্বিতীয় গাছটি এতো ছোট ও দুর্বল ছিল যে সে কোন নদী বা সাগরের উত্তাল ঢেউয়ে ভাসার উপযুক্ত ছিল না। তাকে এক ছোট নৌকা বানিয়ে এক শান্ত হ্রদে জেলেদের মাছ ধরার কাজে লাগিয়ে দেওয়া হল। তৃতীয় গাছটি কাঠের গুদামে স্তুপ করে রাখা অন্যান্য কড়িকাঠের সঙ্গে তার ভাগ্যের জন্য অপেক্ষা করতে থাকলো।


এইভাবে অনেক দিন,অনেক রাত, অনেক বছর কেটে গেল। গাছ তিনটি তাদের ছেলেবেলার স্বপ্ন এবং প্রার্থনার কথা তখনও মনে রেখেছিল।


হঠাত্‍ এক কনকনে শীতের রাতে, একজন দরিদ্র পুরুষ ও একজন সন্তানসম্ভবা মহিলা সেই আস্তাবলে এসে আশ্রয় নিলেন। সেখানে সেই মহিলা এক শিশুর জন্ম দিলেন। মা যখন তার নবজাত কোমল শিশুটিকে পশুদের খড় খাওয়ার সেই বাক্সের মধ্যে রাখলেন, বাক্সটি সোনালি তারার আলোতে ভরে গেল। মা শিশুটির হাত আলতো করে চেপে হেসে উঠে বললেন, "এই বাক্সটি খুব চমৎকার।" ঠিক সেই মুহূর্তে প্রথম গাছটি বুঝতে পারল যে পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদটিকে তার ভিতরে রাখা হয়েছে।


দ্বিতীয় গাছটি কয়েক বছর ধরে দুর্গন্ধযুক্ত মাছ বয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য ব্যবহার করা হচ্ছিল। হঠাত্‍ এক দিন একজন ক্লান্ত পথিক এবং তার কয়েকজন সঙ্গী সেই ছোট্ট নৌকাটিতে গাদাগাদি করে উঠে পড়লেন। দ্বিতীয় গাছটি নিঃশব্দে হ্রদের শান্ত জলে এগিয়ে চললো। ক্লান্ত পথিক একটু পরে ঘুমিয়ে পড়লেন। হ্রদ পেরিয়ে সাগরের জলে পড়তেই বজ্রপাত এবং প্রচণ্ড ঝড় শুরু হল। ছোট গাছটি ভয়ে কেঁপে উঠল। সে জানতো যে এই ঝোড়ো হাওয়া এবং বৃষ্টির মধ্যে দিয়ে এত যাত্রীকে নিরাপদে বয়ে নিয়ে যাওয়ার মত শক্তি তার নেই। এক ঘুমন্ত পথিক জেগে উঠলেন। তিনি উঠে দাঁড়িয়ে হাত বাড়িয়ে বললেন, “শান্তি।“ ঝড় যত তাড়াতাড়ি শুরু হয়েছিল তত তাড়াতাড়ি থেমে গেল। ঠিক সেই মুহূর্তে দ্বিতীয় গাছটি জানতে পারলো, সে সব রাজাদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ রাজাকে বয়ে নিয়ে যাচ্ছে।


প্রায় তিন বছর পর, এক শুক্রবার সকালে, তৃতীয় গাছটি অবাক হয়ে দেখলো, তার কড়িকাঠগুলিকে কাঠের স্তূপ থেকে টেনে হিঁচড়ে বের করে এনে একজন মানুষের কাঁধে রাখা হল। সেই হতভাগ্য মানুষটি টালমাটাল পায়ে শহরের রাগী, অভদ্র মানুষদের ভিড়ের মধ্য দিয়ে ভারী কড়িকাঠগুলি টানতে টানতে এগিয়ে চললেন। সবাই তাকে দেখে ঠাট্টা, বিদ্রুপ করতে লাগলেন। শীর্ণ মানুষটির দুর্দশা ও কষ্ট দেখে তার হৃদয় ভেঙে গেল।


এক ছোট পাহাড়ের উপরে গিয়ে সেই ভিড় থেমে গেল। যখন রাজার সৈন্যরা নির্মমভাবে সেই কড়িকাঠগুলির সঙ্গে মানুষটির হাত ও পায়ে পেরেক ঠুকে দিলেন, তৃতীয় গাছটি ভয়ে কেঁপে উঠল। তারপর সৈন্যরা সেই মানুষটি সমেত কড়িকাঠকে সোজা করে মাটিতে পুঁতে দিলেন, শীর্ণ ব্যক্তিটি ঝুলন্ত অবস্থায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করলেন। সেই হতভাগ্য রক্তাক্ত দেহটিকে ধরে রেখে তৃতীয় গাছটি কেঁদে উঠলো। তার আর নিজেকে সুন্দর, শক্তিশালী বা লম্বা; কোনটাই মনে হল না। নিজেকে সবচেয়ে কুৎসিত, কঠোর এবং নিষ্ঠুর মনে হলো।


কিন্তু রবিবার সকালে, সূর্য উঠতেই, তৃতীয় গাছের নীচে পৃথিবী আনন্দে নেচে উঠল কারণ ঈশ্বরের ভালবাসা তখন সবকিছু বদলে দিয়েছিল। পাহাড়ের নীচে, মানুষেরা চোখ উঁচু করে তার দিকে ভক্তিভরে তাকিয়ে রইলেন। ঠিক সেই মুহূর্তে তৃতীয় গাছটি বুঝতে পারছিল যে সে একটি পাহাড়ের চূড়ায় দৃঢ়ভাবে ঈশ্বরকে ধারণ করে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার মনে হচ্ছিল, সে যেন স্বর্গের একেবারে কাছাকাছি পৌঁছে গেছে।


এইভাবে, বিশ্বের সবচেয়ে কোমল এবং মূল্যবান ধন; শিশু যীশু প্রথম গাছটির কোল আলোকিত করলেন। সেই গাছটি হয়ে উঠলো সবচেয়ে সুন্দর বাক্স। দ্বিতীয় গাছটি ঈশ্বরের পুত্রকে হ্রদের ওপারে পৌঁছে দিয়ে হয়ে উঠলো সবচেয়ে শক্তিশালী গাছ। যতবারই মানুষ ক্রুশের আকৃতিতে তৃতীয় গাছের কথা ভেবেছেন, ততবারই তারা স্বর্গের ঈশ্বরের কথা ভেবেছেন। সে হয়ে উঠলো বিশ্বের সবচেয়ে লম্বা গাছ।


অনেক দিন আগে, তিনটি ছোট গাছ যখন তাদের স্বপ্নের কথা আলোচনা করছিল, তারা কল্পনাও করতে পারেনি যে তাদের প্রাপ্তি তাদের স্বপ্নকে ছাড়িয়ে যাবে। প্রতিটি গাছকে ঈশ্বরের মহান পরিকল্পনায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ দেওয়া হয়েছিল। তারা বুঝতে পারলো, ঈশ্বর তাঁর উদ্দেশ্য সাধনের জন্য নিজের মত করে তাদের তৈরি করেছেন। 


এই লোককথার গাছগুলির মতো আমাদের সবারই স্বপ্ন থাকে। কিন্তু জীবন সবসময় মসৃণ হয় না; কখনও কখনও স্বপ্ন ভেঙেও যেতে পারে। আমরা এমন পরিস্থিতিতে পৌঁছে যেতে পারি, যা আমরা কখনও চাইনি। এ সবই জীবনের স্বাভাবিক অংশ। দুঃখ-কষ্ট, বিপদ-আপদ—সবই সাময়িক; তাই সেগুলো দেখে ভয় পাওয়া বা ভেঙে পড়া উচিত নয়।


বিশ্বাসই মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোয় নিয়ে আসে। যখন সবকিছু ভেঙে পড়ে বলে মনে হয়, তখনও বিশ্বাসই আমাদের নতুন করে দাঁড়াতে শেখায়। তাই হার মানা নয়—প্রতিটি ভাঙনের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে নতুন করে গড়ে ওঠার সম্ভাবনা। বিশ্বাস ধরে রাখলেই, একদিন সেই স্বপ্ন আবার নতুন রূপে ফিরে আসবেই।

No comments