Page Nav

HIDE

Grid Style

GRID_STYLE

Post/Page

Weather Location

Breaking News:

latest

ইউনিফর্ম নম্বর ৬৭: জয় অসম্ভব জেনেও যে দৌড়বিদ থেমে যাননি: অশিস কুমার পন্ডা

ইউনিফর্ম নম্বর ৬৭: জয় অসম্ভব জেনেও যে দৌড়বিদ থেমে যাননি: অশিস কুমার পন্ডা
১৯৬৪ সালের ১৪ অক্টোবর। টোকিও অলিম্পিকের পঞ্চম দিনের শেষ বিকেল। জাপানের জাতীয় স্টেডিয়ামে জড়ো হয়েছেন প্রায় সত্তর হাজার উচ্ছ্বসিত দর্শক।  শুরু হতে চলেছে পুরুষদ…

 




ইউনিফর্ম নম্বর ৬৭: জয় অসম্ভব জেনেও যে দৌড়বিদ থেমে যাননি: অশিস কুমার পন্ডা


১৯৬৪ সালের ১৪ অক্টোবর। টোকিও অলিম্পিকের পঞ্চম দিনের শেষ বিকেল। জাপানের জাতীয় স্টেডিয়ামে জড়ো হয়েছেন প্রায় সত্তর হাজার উচ্ছ্বসিত দর্শক।  শুরু হতে চলেছে পুরুষদের ১০,০০০ মিটার দৌড়। ২৩টি দেশের ৩৮ জন সেরা দৌড়বিদ স্টার্টিং লাইনে দাঁড়িয়ে পড়েছেন। তাদের মধ্যে ছিলেন তখনকার সিলন (বর্তমান শ্রীলঙ্কা) দেশের এক তরুণ দৌড়বিদ—রানাতুঙ্গা কোরালাগে জয়াসেকারা করুণানন্দা—ইউনিফর্ম নম্বর ৬৭। তিনি ছিলেন অলিম্পিকের ইতিহাসে এই ইভেন্টে তাঁর দেশের প্রথম প্রতিনিধি।


১০,০০০ মিটার দৌড় কোন সামান্য দৌড় নয়; ৪০০ মিটার ট্র্যাকে ২৫ বার দৌড়ে  ফিনিশিং লাইনে পৌঁছাতে হয়। শুধু গতি নয়, এই দৌড়ে সহনশীলতা, শারীরিক ও মানসিক শক্তির এক কঠিন পরীক্ষা দিতে হয়।


ঘড়িতে তখন ঠিক বিকাল ৪-০৫, বন্দুকের শব্দে দৌড় শুরু হলো। স্টেডিয়ামের দর্শকরা গর্জে উঠলেন, নিজের নিজের দেশের পতাকা ওড়াতে লাগলেন। প্রথম দু’শো মিটার পর্যন্ত সবাই যেন রঙিন স্রোতের মতো একসঙ্গে এগিয়ে চললেন। ধীরে ধীরে শক্তিশালী ও দুর্বলদের মধ্যে দূরত্ব স্পষ্ট হতে লাগল। প্রথম ল্যাপ শেষ হওয়ার আগেই করুণানন্দা সকলের চেয়ে পিছিয়ে পড়লেন। সামনের দৌড়বিদরা যখন দশম ল্যাপ শেষ করছিলেন, করুণানন্দা তখন নবম ল্যাপে। তার শরীর ঘামে ভিজে যাচ্ছিল, পা কাঁপছিল। শেষ হওয়ার আগেই নয়জন দৌড়বিদ প্রতিযোগিতা ছেড়ে দিলেন। তবু করুণানন্দা থামলেন না। প্রতি ল্যাপেই তিনি আরও পিছিয়ে পড়তে লাগলেন।


অবশেষে দৌড় শেষ হলো। যুক্তরাষ্ট্রের বিলি মিলস স্বর্ণপদক জিতলেন, তিউনিসিয়ার মোহাম্মদ গাম্মৌদি রৌপ্যপদক পেলেন, আর অস্ট্রেলিয়ার রন ক্লার্ক ব্রোঞ্জ জিতলেন। স্টেডিয়াম করতালিতে মুখর হয়ে উঠল। বাস্তবিক অর্থে দৌড় শেষ হয়ে গেল। দর্শকেরা উঠে দাঁড়াতে শুরু করলেন, অলিম্পিকের পঞ্চম দিনের কাহিনী শেষ।


কিন্তু কাহিনী তখনও পুরো শেষ হয়নি।


ট্র্যাকে তখনও একজন দৌড়বিদ দৌড়াচ্ছেন—করুণানন্দা, ইউনিফর্ম নম্বর ৬৭। তিনি অনেক পিছিয়ে, তবু থামেননি। কিছুক্ষণ আগেও যে স্টেডিয়াম গর্জন করছিল, এখন তা বিস্ময়ে তাকিয়ে আছে। কেউ মুচকি হাসলেন, কেউ কটূক্তি করলেন। ব্যথায় কাতর, তবুও ধীর পদক্ষেপে সেই বিশাল স্টেডিয়ামে তিনি একাই দৌড়াতে লাগলেন। ধীরে ধীরে স্টেডিয়ামের পরিবেশ বদলাতে শুরু করল। কটূক্তি থেমে গেল। কয়েকজন হাততালি দিতে শুরু করলেন। তারপর আরও অনেকে যোগ দিলেন। যারা বেরিয়ে যেতে চেয়েছিলেন, তারা ফিরে তাকালেন। অল্প সময়ের মধ্যে পুরো স্টেডিয়াম দাঁড়িয়ে পড়লো। যে মানুষটি সবার শেষে দৌড় শেষ করছেন, তাঁর জন্যই সবাই হাততালি দিচ্ছেন। অনেকের চোখে জল এসে গেল। তারা সেখানে পরাজয় নয়, সাহস দেখছিলেন; দুর্বলতা নয়, মর্যাদা দেখছিলেন। তারা কোন রেকর্ডভাঙা চ্যাম্পিয়নের জন্য নয়, এমন একজন মানুষের জন্য করতালি দিচ্ছিলেন, যিনি হার মানেননি। করুণানন্দা যখন শেষমেশ ফিনিশ লাইন অতিক্রম করলেন, স্টেডিয়াম আগের চেয়ে আরও জোরে গর্জন করতে লাগলো।


প্রতিযোগিতার আগে প্রায় এক সপ্তাহ ধরে তিনি অসুস্থ ছিলেন। তাঁর শরীর ভালো ছিল না। শরীরে তীব্র ব্যথা ছিল, শক্তিও স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক কম। তবু তিনি স্টার্টিং লাইনে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। অলিম্পিকে নিজের দেশকে প্রতিনিধিত্ব করা কোন সাধারণ সুযোগ নয়। সিলনের মতো ছোট ও দরিদ্র দেশের জন্য একজন অ্যাথলেটকে অলিম্পিকে পাঠানো মানে ছিল বড় ত্যাগ ও মূল্যবান সম্পদের ব্যয়। করুণানন্দা তা জানতেন। তিনি শুধু নিজের আশা নয়, দেশের গর্বও বহন করছিলেন।


দৌড় শেষে সাংবাদিকরা তাঁকে ঘিরে একটি প্রশ্ন করলেন, “আপনি কেন হাল ছাড়লেন না?” তিনি সহজেই থামতে পারতেন। তিনি অসুস্থ ছিলেন, অনেক পিছিয়ে ছিলেন। কেউ তাঁকে দোষ দিত না।


করুণানন্দার উত্তর ছিল সহজ ও আন্তরিক। তিনি বললেন, “আমার বাড়িতে একটি ছোট মেয়ে আছে। একদিন সে বড় হলে আমি তাকে বলতে চাই, তার বাবা টোকিও অলিম্পিকে গিয়েছিল এবং শেষ পর্যন্ত দৌড়েছিল, যদিও সে হেরেছিল।” তিনি আরও বললেন, “আমার দেশ আমাকে এখানে পাঠাতে বড় ত্যাগ স্বীকার করেছে। আমি মাঝপথে ছেড়ে দিয়ে সেই সুযোগ নষ্ট করতে পারতাম না। যেহেতু আমি দৌড় শুরু করেছি, তাই আমাকে শেষ করতেই হতো।” তাঁর কথা নাটকীয় ছিল না, তা ছিল হৃদয়ের গভীর থেকে বলা সত্য।


জাপানের মানুষ সেই বিকেলটি কখনো ভুলে যায়নি। তাঁর সাহস জাপানকে এত গভীরভাবে স্পর্শ করেছিল যে তাঁর কাহিনী অধ্যবসায়ের প্রতীক হয়ে ওঠে। পরে “ইউনিফর্ম নম্বর ৬৭” শিরোনামে এটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্ত করা হয়, যেখানে শিশুদের দৃঢ়তা ও মর্যাদার শিক্ষা দেওয়া হয়।


এই কাহিনীর শিক্ষা খুব স্পষ্ট: তুমি যা শুরু করেছ, তা শেষ করো। জীবনে সব সময় জয় আসবে না। কখনো তুমি ক্লান্ত হবে, অন্যদের থেকে পিছিয়ে পড়বে, ছেড়ে দিতে ইচ্ছা করবে। কিন্তু প্রকৃত সাফল্য কেবল জেতার মধ্যে নয়; সাফল্য হলো অসম্ভব মনে হলেও দায়িত্ব পালন করে এগিয়ে যাওয়া। মাঝপথে ছেড়ে দিলে সাময়িক স্বস্তি মিলতে পারে, কিন্তু শেষ করলে যে আত্মসম্মান পাওয়া যায়, তা চিরস্থায়ী।

No comments