কারাগারের ভিতর ক্রিস্টোফার হ্যাভেন্সের গণিতের আলোয় মুক্তি — আশিস কুমার পন্ডা
ক্রিস্টোফার হ্যাভেন্সের জীবনের শুরুটা খারাপ জায়গা থেকে হয়নি। তিনি বড় হয়েছিলেন এক সাধারণ আমেরিকার পরিবারে। মা, টেরি ফোর্টে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীতে …
কারাগারের ভিতর ক্রিস্টোফার হ্যাভেন্সের গণিতের আলোয় মুক্তি — আশিস কুমার পন্ডা
ক্রিস্টোফার হ্যাভেন্সের জীবনের শুরুটা খারাপ জায়গা থেকে হয়নি। তিনি বড় হয়েছিলেন এক সাধারণ আমেরিকার পরিবারে। মা, টেরি ফোর্টে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীতে দায়িত্ব শেষ করে নার্সের কাজ করতেন। ছোটবেলা থেকেই ক্রিস্টোফার ছিলেন খুব মেধাবী আর কৌতূহলী। গণিত তার খুব প্রিয় ছিল—এমনকি ছোট ক্লাস থেকেই তিনি বন্ধুদের গণিত বোঝাতে শুরু করেছিলেন। কিন্তু আলাদা হয়ে ওঠার চেয়ে দলে মিশে যাওয়াই তখন তার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। বন্ধুদের সঙ্গে মিশতে গিয়ে তিনি ধীরে ধীরে ভুল পথে পা বাড়ান। যা শুরু হয় গাঁজা আর মদ্যপান দিয়ে, তা ধীরে ধীরে গিয়ে পৌঁছায় ম্যাজিক মাশরুম ও এলএসডিতে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই পরীক্ষা-নিরীক্ষা পরিণত হয় নির্ভরতায়—প্রথমে ব্যথানাশক ওষুধ, তারপর ক্রিস্টাল মেথ। নেশার প্রতিটি ধাপ তাকে বদলে দিতে থাকে। তিনি আর আগের সেই মানুষটি থাকেননি।
এই পতনের শেষ পরিণতি ছিল হিংস্রতা। নেশা আর নিয়ন্ত্রণ হারানোর চরম মুহূর্তে, এক মাদক-সংক্রান্ত ঝগড়ায়, একত্রিশ বছর বয়সী ক্রিস্টোফার এক ব্যক্তিকে হত্যা করে ফেলেন। ২০১১ সালে তাকে গ্রেপ্তার করে, দোষী সাব্যস্ত করা হয়, এবং ওয়াশিংটনের একটি সর্বোচ্চ নিরাপত্তার কারাগারে পঁচিশ বছরের সাজা দেওয়া হয়।
কারাগারে তার শুরুর দিনগুলিতেও অতীতেরই প্রতিফলন ছিল—নিয়ম ভাঙা, গ্যাংয়ের সঙ্গে জড়িয়ে পড়া—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। শেষ পর্যন্ত এক কয়েদীর সঙ্গে মারামারির পর এক বছরের জন্যে তাকে রাখা হয় এক নিঃসঙ্গ কারাগারে— বন্দিদের ভাষায় “The hole (অন্ধকূপ)।” ছোট, ঠান্ডা কংক্রিটের একটি কোষ—চারদিকে ফাঁকা দেয়াল, নিজের শরীরের দুর্গন্ধ, আর দিন-রাত চোখে চোখ রেখে জ্বলে থাকা নির্মম ফ্লুরসেন্ট আলো। আলো সেখানে কখনও নিভত না। জায়গাটি যেন কয়েদীদের মন ভেঙে দেওয়ার জন্যই তৈরি করা হয়েছিল। পাশের কোষ থেকে ভেসে আসা অবিরাম লাথির শব্দ, আর্তচিৎকার আর ভাঙা গলার হাহাকার শুনে তিনি বুঝতে পারতেন, অনেকেই সেখানে ভেঙে পড়ছেন। সেই বিচ্ছিন্নতায়, দীর্ঘ শূন্য সময়ের মধ্যে, তার ভবিষ্যতের উপর যেন স্থায়ীভাবে সিলমোহর লাগিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তার মনে হচ্ছিল, জীবন বুঝি এখানেই শেষ— কারো কাছে তার আর কোনও মূল্য নেই। সেই ঠান্ডা ঘরে তিনি মরে না গিয়ে শুধুমাত্র টিকে রইলেন।
বেশিরভাগ মানুষের জন্য কারাগার মানেই সব আশার শেষ। কিন্তু অদ্ভুতভাবে, এখানেই ক্রিস্টোফারের জীবন যেন নতুন করে শুরু হল। কারাগার তাকে অনেক সময় দিল—ভুলের মুখোমুখি হওয়ার সময়, বছরের পর বছর ধরে বয়ে চলা বিশৃঙ্খল জীবনের দিকে তাকানোর সময়, আর জীবনে প্রথমবার নিজের মনের কথা শোনার সময়।
হাইস্কুল ছেড়ে দেওয়া, নেশায় ডুবে যাওয়া—নিজেকে কোনওদিনই ক্রিস্টোফার পড়ুয়া বা গবেষক ভাবেননি। নিঃসঙ্গতা আর অসহ্য একঘেয়েমির সঙ্গে লড়াই করতে তিনি ধাঁধার সমাধান করতে শুরু করলেন। একদিন লক্ষ্য করলেন, কয়েকজন বন্দি খাম পাচ্ছেন—ভেতরে গণিতের সমস্যা। উচ্চাকাঙ্ক্ষা নয়, কৌতূহল থেকেই তিনি একবার চেষ্টা করলেন। গভীর রাত পর্যন্ত জেগে তিনি গণিতগুলির সমাধানও করে ফেললেন। সেই সাফল্যটাই যেন সব বদলে দিল। জীবনে প্রথমবার, পৃথিবীটা তার কাছে অর্থপূর্ণ মনে হলো। ধাঁধার থেকেও গণিত তার কাছে অনেক বেশি আকর্ষক মনে হল। এরপর তিনি আর থামলেন না। একসময় যে জীবন বরাবরই বিশৃঙ্খল আর নির্মম ছিল, সেখানে গণিত এনে দিল সরলতা ও স্বচ্ছতা। গণিতের নিয়মগুলি কঠোর, যুক্তিগুলি সৎ। গণিতের সমস্যাগুলি তার অতীত নিয়ে মাথা ঘামাত না—তারা শুধু ধৈর্য, মনোযোগ আর পরিশ্রম চাইত। প্রতিটি সঠিক সমাধান তাকে এমন এক নীরব আত্মসম্মান দিতে লাগলো, যা তিনি আগে কখনও অনুভব করেন নি।
তিনি আরও বই চাইলেন। আরও কঠিন বই। নিজে নিজে শিখলেন সাধারণ গণিত, তারপর বীজগণিত, তারপর ক্যালকুলাস। এ এক অন্যরকম নেশা! রাতের পর রাত নিজের সেলে বসে তিনি সমীকরণ আর প্রমাণ লিখে খাতা ভরিয়ে ফেলতে লাগলেন। যা শুরু হয়েছিল সময় কাটানোর উপায় হিসাবে, সেটাই হয়ে উঠল তার ভরসা। গণিত শুধু তার মনকে ব্যস্ত রাখেনি—তার ভেতরের দুনিয়াটাকেও গুছিয়ে দিতে লাগলো। জীবনে প্রথমবার তিনি নিজের একটা উদ্দেশ্য খুঁজে পেলেন।
একসময় সমস্যাগুলি এত কঠিন হয়ে উঠল যে একা সমাধান করা সম্ভব হচ্ছিল না। অনেকেই সেখানে থেমে যেতে পারতেন, কিন্তু ক্রিস্টোফার নিলেন এক দুঃসাহসী সিদ্ধান্ত—তিনি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের পেশাদার গণিতবিদদের চিঠি লিখতে শুরু করলেন। বেশিরভাগই কোনও উত্তর দিলেন না। কিন্তু একজন দিলেন—ইতালির তুরিন বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিতের অধ্যাপক উমবের্তো চেরুতি। তিনি দয়া, সহানুভূতি, বা উৎসাহ— কোনটাই না দেখিয়ে, সরাসরি চ্যালেঞ্জ দিয়ে উত্তর দিলেন। পাঠিয়ে দিলেন সংখ্যা তত্ত্বের জটিল গণিত—এমন গণিত, যা অনেক প্রশিক্ষিত গবেষকদেরও পরীক্ষায় ফেলে দেয়।
শুধু কাগজ, পেন্সিল আর বই সম্বল করে, ক্রিস্টোফার সেই অঙ্কে ডুবে গেলেন। তিনি এমন বিষয় নিয়ে কাজ করছিলেন, যা দুই হাজার বছর আগে প্রাচীন গ্রিসের মহান গণিতবিদ ইউক্লিড করেছিলেন। এটা কোনও ক্লাসের পড়া ছিল না। এটা ছিল সত্যিকারের গবেষণা। আর একদিন তিনি সত্যিই নতুন কিছু খুঁজে পেলেন— এক মৌলিক গবেষণা। সংখ্যার মধ্যে এমন কিছু সম্পর্ক তিনি দেখলেন, যা এতদিন আলোচনা হয়নি। তিনি যুক্তিপূর্ণ বিশ্লেষণের সবটা হাতে লিখে অধ্যাপক চেরুতিকে পাঠিয়ে দিলেন। চেরুতি অবাক হয়ে গেলেন। তিনি সেই কাজ সহকর্মীদের দেখালেন। কঠোর পর্যালোচনার পর তারা এর বৈধতা নিশ্চিত করলেন।
২০২০ সালে সেই গবেষণা প্রকাশিত হয় Research in Number Theory নামে এক নামী জার্নালে। কোনও কলেজের ডিগ্রি নেই, কম্পিউটার নেই, বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারে যাওয়ার সুযোগ নেই—দশকের পর দশক ধরে কারাগারে বন্দি একজন মানুষ গণিতের ভাণ্ডারে মৌলিক অবদান রাখলেন। এই সাফল্য শুধু এই কারণে বিস্ময়কর নয় যে তা একজন বন্দির কাছ থেকে এসেছে। কোনও শর্ত ছাড়াই, এটি সর্বোচ্চ শিক্ষার মানদণ্ডেও অনায়াসে উত্তীর্ণ হয়েছে।
এই সাফল্যের পর ক্রিস্টোফার ভাবলেন—যেটা তিনি পেয়েছেন, সেটা অন্যদেরও দেবেন। শুরু করলেন Prison Mathematics Project—একটি অলাভজনক উদ্যোগ, যা বন্দিদের গণিত শেখার সুযোগ দেয়, বই ও উপকরণ জোগাড় করে, আর বাইরের গণিতবিদদের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ করায়। কারাগারের ভেতর থেকেই তিনি এখন অন্যদের জীবনে শৃঙ্খলা, আশা আর আত্মবিশ্বাস ফেরাতে সাহায্য করছেন।
২০৩৬ সালের আগে ক্রিস্টোফার মুক্তি পাবেন না। তবুও এক অর্থে তিনি এখনই মুক্ত—ভাবনায় মুক্ত, শেখায় মুক্ত, কিছু দেওয়ার স্বাধীনতায় মুক্ত। তিনি কখনও তার অপরাধ অস্বীকার করেন নি। তিনি তার কাজ উৎসর্গ করেছেন সেই মানুষটির স্মৃতিতে, যাকে তিনি হত্যা করেছিলেন—র্যান্ডেন রবিনসন। তার কথায়, ওই নামটি তাকে মনে করিয়ে দেয়, তিনি কোথায় ভুল করেছিলেন আর এখন কোন পথে চলা উচিত। তিনি বলেন, “আমি ওই জীবনে আর ফিরতে পারি না। আমি সেখানে ইতিমধ্যেই ব্যর্থ হয়েছি। আমি মানুষকে অনেক কষ্ট দিয়েছি, আর সেই ঋণ কখনও শোধ করা যাবে না। সেটা সারাজীবন মনে রেখেই আমাকে এগিয়ে যেতে হবে।”
শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক এবং কারা-সংস্কার আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা ক্রিস্টোফার হেভেন্সের গল্পকে শুধু মেধার জয় হিসেবে দেখেন না; তারা এটিকে এক প্রমাণ হিসাবে তুলে ধরেন যে মানুষের সম্ভাবনা অনেক সময় ক্ষমতার অভাবে নয়, বরং পরিস্থিতির বেড়াজালে আটকে যায়। তবে এই গল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়তো গণিত নয়—গুরুত্বপূর্ণ হলো রূপান্তরের মাধ্যমে আরো উন্নত হয়ে ওঠা।
ক্রিস্টোফার হ্যাভেন্সের পরিবর্তণ তার অপরাধকে কোনোভাবেই সমর্থন করে না, বা আমাদের তা ভুলে যেতে বলেও না। বরং আমাদের মনে করিয়ে দেয়—মানুষ তার করা সবচেয়ে খারাপ কাজের চেয়েও অনেক বড়। সমাজের সবচেয়ে ভুলে যাওয়া এক কোণেও শিক্ষার আলো পৌঁছে যেতে পারে, আর পরিবর্তনের শুরু হতে পারে নিঃশব্দে—এক জেলের ঠান্ডা মেঝেয়, পুরোনো বই আর কৌতূহলী এক মন থেকে। মুক্তির আশা সব সময়ই থাকে, আর তা অনেক সময় কোন হৈচৈ বা করুণার হাত ধরে আসে না, বরং আসে ধৈর্য, শৃঙ্খলা আর নতুন করে শুরু করার সাহসী সিদ্ধান্তের মাধ্যমে।

No comments