Page Nav

HIDE

Grid Style

GRID_STYLE

Post/Page

Weather Location

Breaking News:

latest

নিখুঁত পৃথিবীর (Biosphere 2 – 1991) বিপর্যয়: আশিস কুমার পন্ডা

এক নিখুঁত পৃথিবীর (Biosphere 2 – 1991) বিপর্যয়: আশিস কুমার পন্ডা
১৯৯১ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর। যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনার মরুভূমিতে শুরু হয়েছিল, দু’বছর মেয়াদী এক সাহসী পরীক্ষা—বায়োস্ফিয়ার-২  (Biosphere 2)। সম্পূর্ণ বেসরকারিভাবে তৈরি হ…

 



এক নিখুঁত পৃথিবীর (Biosphere 2 – 1991) বিপর্যয়: আশিস কুমার পন্ডা


১৯৯১ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর। যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনার মরুভূমিতে শুরু হয়েছিল, দু’বছর মেয়াদী এক সাহসী পরীক্ষা—বায়োস্ফিয়ার-২  (Biosphere 2)। সম্পূর্ণ বেসরকারিভাবে তৈরি হয়েছিল ১৫০ মিলিয়ন ডলারের এই ভবিষ্যৎমুখী স্থাপনাটি—কাঁচে ঘেরা, বাইরের পৃথিবীর থেকে বিচ্ছিন্ন আর এক কৃত্রিম ও নিখুঁত পৃথিবী। উদ্দেশ্য ছিল বড়—টেকসই জীবনব্যবস্থা নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা, আর জীবমণ্ডলবিদ্যা (Biospherics) নামে এক নতুন বিজ্ঞানের সাহায্যে ঠিক পৃথিবীর মতো একটি বন্ধ স্বয়ংসম্পূর্ণ পরিবেশ কতটা নিজে নিজে টিকে থাকতে পারে—তা দেখা। প্রায় ৩.১৪ একর জায়গা জুড়ে তৈরি এই কাঁচ আর স্টিলের দুনিয়ার ভিতরে ছিল সবকিছু—বর্ষাবন (Rain-forest), মরুভূমি, ম্যানগ্রোভ জলাভূমি, কোরাল রিফসহ কৃত্রিম সমুদ্র, আর চাষের জমি। ভিতরে ছিলেন আটজন বিজ্ঞানী, সঙ্গে প্রায় ৩,০০০ প্রজাতির গাছ আর প্রাণী। ৯১ ফুট উঁচু এই কাঠামোর ভেতরে আলো, জল, তাপমাত্রা, মাটির মান—সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছিল একেবারে নিখুঁতভাবে। গাছগুলো পেত পরিষ্কার জল, উপযুক্ত আলো, উর্বর মাটি, আর পোকামাকড় থেকে সুরক্ষা। কিন্তু একটা জিনিস ইচ্ছে করেই বাদ রাখা হয়েছিল—ঝড়ো হাওয়া।


শুরুর দিনগুলোতে সবকিছু স্বপ্নের মতো লাগছিল। চোখের সামনে জঙ্গল বেড়ে উঠছিল। গাছগুলো অস্বাভাবিক হারে লম্বা হচ্ছিল। পাতাগুলো ছিল ঘন, সবুজ, প্রাণ-ভরা। কাণ্ড সোজা হয়ে যেন আকাশ ছুঁতে চাইছিল। বাইরে থেকে দেখে মনে হচ্ছিল—সব ঠিকঠাক ও সফলভাবে চলছে। যেন চাষির জীবনের সেরা মৌসুম—দ্রুত, সহজ, আর সম্পূর্ণ নিরাপদ।


তারপর হঠাৎ করেই সব বদলে গেল। একদিন দেখা গেল—জঙ্গল ভেঙে পড়ছে। গাছগুলো কিন্তু খরার মুখে পড়েনি, কোন রোগ বা আক্রমণের শিকার হয়নি, কোন ঝড় তাদের আঘাত করেনি। তবুও একে একে তারা দুর্বল কান্ড ভেঙে বা অগভীর শিকড় উপড়ে ধরাশায়ী হয়ে যাচ্ছিল। পতনগুলি ছিল হঠাৎ, নিঃশব্দ, আর ভয় ধরানো।


বিজ্ঞানীরা স্তব্ধ হয়ে গেলেন। বায়ো-স্পেশালিস্ট, উদ্ভিদবিদ, উদ্ভিদ-পুষ্টিবিদ—সবাই তাদের চোখ দিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বিশ্লেষণ করলেন। কোথায় ভুল হলো? কী বাদ পড়লো? কোথাও কী যত্নের অভাব ছিল? পরিকল্পনায় কী কোন ফাঁক ছিল? ম্যারাথন আলোচনা, তর্ক, বিশ্লেষণের পর তারা এক স্পষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছালেন।


গাছগুলোর যত্নের অভাব ছিল না, যা ঘটেছিল তা ছিল অতিরিক্ত যত্নের ফল।


এই কৃত্রিম জঙ্গলে যে জিনিসটি কখনোই ছিল না, তা হলো প্রতিরোধ। গাছগুলোকে দোলানোর মতো বাতাস সেখানে ছিল না। তাদের শক্ত হতে শেখানোর মতো চাপ ছিল না। প্রতিদিন একটু একটু করে লড়াই করার সুযোগ ছিল না। প্রকৃতিতে বাতাস গাছকে নড়াচড়া করতে বাধ্য করে। তাতেই কাণ্ড শক্ত হয়, শিকড় আরও গভীরে গিয়ে মাটিকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে। কোনরকম লড়াই না থাকলে বৃদ্ধির মধ্যে ধোঁকা থেকে যায়—লম্বা হলেও ফাঁপা, দেখতে সুন্দর হলেও ভিতরে দুর্বল।

Biosphere 2 অভিযান পৃথিবীর মতো ভারসাম্যপূর্ণ ও স্বনির্ভর এক বাস্তুতন্ত্র বানাতে পারেনি বটে, কিন্তু এই ব্যর্থতা এক বড় শিক্ষা দিয়ে গেছে।

আর এখানেই জীবন ও অভিভাবকত্ব—উভয়কেই থেমে গিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে।

যে সব শিশু সব সময় নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে বড় হয়—যাদের কষ্ট, ব্যর্থতা, সমালোচনা আর চ্যালেঞ্জ থেকে দূরে রাখা হয়—তারা বাইরে থেকে খুব ভালোভাবে বেড়ে উঠছে বলে মনে হতে পারে। ভালো নম্বর, ভালো অভ্যাস, নিখুঁত ও নিরাপদ রুটিন! কিন্তু শক্তি কখনো আরামে তৈরি হয় না, আর চরিত্র গড়ে ওঠে না স্বস্তিতে। যখন বাবা-মা সব বাধা সরিয়ে দেন, তখন তারা অজান্তে সহনশীলতা শেখার জায়গাটাও মুছে দেন। শিশুদের পড়ে যেতে না দিলে তারা দাঁড়াতে শিখবে কী করে? আগেই সব সমস্যার সমাধান করে দিলে, তাদের সমস্যা সামলানোর ক্ষমতা জন্মাবে  কী করে? চাপহীন সুরক্ষা আত্মবিশ্বাস তৈরি করে না, তৈরি করে ভঙ্গুরতা।

তাই, শিশুদের একটু বিরোধ, লড়াইয়ের মুখোমুখি হতে দিন। তাদের ব্যর্থতা, হতাশার কষ্ট ও দায়িত্বের ওজন অনুভব করতে দিন। এগুলো নিষ্ঠুরতা নয়—এগুলো প্রয়োজন। যেমন বাতাস গাছের শত্রু নয়, তেমনি কষ্টও শিশুর শত্রু নয়। কষ্টই তাকে শক্ত করে।

ঝড়হীন জীবন সেই সব মানুষ তৈরি করে, যারা জীবনের প্রথম ঝড়েই ভেঙে পড়ে। দীর্ঘ আরাম থেকে জন্ম নেয় আত্মতুষ্টি আর নরমভাব। এই নরমভাব বিচারবোধ ও দায়িত্ববোধকে দুর্বল করে দেয়। আর যখন মানুষ চাপ বা হুমকি সামলাতে ব্যর্থ হয়, তখন সমাজ ধীরে ধীরে কঠিন সময়ের দিকে গড়িয়ে যায়।

এখানে, অভিভাবকদের জন্য শিক্ষা খুব স্পষ্ট, আর কিছুটা অস্বস্তিকর।

শিশুকে আরামে বাঁচার জন্য বড় করবেন না, তাকে শক্তিশালী হয়ে ওঠার জন্য বড় করুন। তাকে বাঁকতে দিন, লড়তে দিন, নিজের শিকড়ের শক্তিতে দাঁড়াতে দিন। কারণ একদিন ঝড় আসবেই— আর শুধু তারাই টিকে থাকবে, যারা সেই ঝড়ের মুখোমুখি হওয়ার জন্য শক্ত হয়েছে।

No comments