Page Nav

HIDE

Grid Style

GRID_STYLE

Post/Page

Weather Location

Breaking News:

latest

মা গুহ্যকালী, আকালিপুর, বীরভূম: কথিত আছে ইনি জরাসন্ধের ইষ্টমাতৃকা ছিলেন- তমাল দাশগুপ্ত

মা গুহ্যকালী, আকালিপুর, বীরভূম: কথিত আছে ইনি জরাসন্ধের ইষ্টমাতৃকা ছিলেন- তমাল দাশগুপ্ত ★ মহাভারতে পৌণ্ড্রক বাসুদেবের সঙ্গে বা জরাসন্ধের সঙ্গে আর্যাবর্তের সঙ্ঘাতের সংবাদ পাওয়া যায়। পুণ্ড্র বাসুদেব নিয়ে আগে এই পেজেই লিখেছি। তন্ত্রধ…

 




মা গুহ্যকালী, আকালিপুর, বীরভূম: কথিত আছে ইনি জরাসন্ধের ইষ্টমাতৃকা ছিলেন- তমাল দাশগুপ্ত 

★ মহাভারতে পৌণ্ড্রক বাসুদেবের সঙ্গে বা জরাসন্ধের সঙ্গে আর্যাবর্তের সঙ্ঘাতের সংবাদ পাওয়া যায়। পুণ্ড্র বাসুদেব নিয়ে আগে এই পেজেই লিখেছি। তন্ত্রধর্মীয় সভ্যতার প্রতিভূ হিসেবে জরাসন্ধের কাহিনী পাঠ করা যায়, তিনি শৈশবে জরা নামক অরণ্যদেবীর আশীর্বাদপ্রাপ্ত হয়েছিলেন বলেই জরাসন্ধ নাম। এই জরা পরে রাক্ষসী প্রভৃতি আখ্যা পেলেও আদতে ইনি মগধের স্থানীয় ভৈরবী অথবা লৌকিক মাতৃকা। এবং জরা নামটি সম্ভবত বৃদ্ধা মাতার সমার্থক, এখনও যেমন আমরা স্থানীয় চণ্ডী বা কালীর আগে পরে বুড়ি, বুড়ো শব্দের ব্যবহার দেখি।


জরাসন্ধ নরবলির মাধ্যমে উপাস্য মাতৃকাকে তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে যুদ্ধে পরাজিত রাজাদের বন্দী  করেছিলেন আমরা জানি। জরাসন্ধ তন্ত্রসাধনা করতেন সন্দেহ নেই।


★ রাণী অহল্যা বাঈ এই মূর্তিটি খুঁজে পেয়েছিলেন প্রথম, এবং তিনি চৈত সিংহকে দেন, কথিত আছে।  এরপর কাশীর রাজা চৈত সিংহ এই মূর্তিটি গঙ্গাবক্ষে লুকিয়ে রাখেন কারণ ওয়ারেন হেস্টিংস নাকি মূর্তিটি বিলেতে পাঠিয়ে দিতে চেয়েছিলেন।  রাজা নন্দকুমার মূর্তিটি কাশী থেকে নিয়ে আসেন। একটি বিকল্প কাহিনীতে শোনা যায়, ওয়ারেন হেস্টিংস রাজা চৈত সিংহের ধনসম্পত্তি লুট করার সময় এই বিগ্রহও নিয়ে আসেন, সেটা হেফাজতখানায় থাকে, নন্দকুমার সেখান থেকে নিয়ে এসেছিলেন।


নন্দকুমার মাকে নিয়ে আসেন তাঁর জন্মস্থান ভদ্রপুর, বীরভূমে। ব্রাহ্মণী নদীর তীরে শ্মশান, সেই শ্মশানে মা গুহ্যকালীর অধিষ্ঠান হয়। এই মায়ের আরেক নাম আকালী, তিনি কালরহিত, কালের অতীত। তাঁর পূজাস্থলে কালের অভাব, অর্থাৎ আকাল: যেখানে কালস্রোত থমকে যায়। মায়ের নামেই মৌজার নাম আকালিপুর।


★ মায়ের বিগ্রহ জরাসন্ধের সময়ের নয়, সেযুগের মাতৃমূর্তি এমন হত না, কিরকম হত জানতে পাণ্ডু রাজার ঢিবির মাতৃমূর্তি দেখতে পারেন, এই পেজে আগে লিখেছি।


মা গুহ্যকালীর এই বিগ্রহ মধ্যযুগের শেষে নির্মিত। কিন্তু মায়ের সঙ্গে শিবের অনুষঙ্গ নেই, পদতলে শিব নেই, কাজেই অনুমান করা যায় একটি অতি প্রাচীন মূর্তিকল্প থেকেই এই বিগ্রহটি পরবর্তী যুগে নির্মিত। শশাঙ্কপূর্বযুগে শিবের সঙ্গে শক্তির সম্পর্ক স্থাপিত হয়নি আমরা জানি, আগে অনেকবার লিখেছি। শ্রী শ্রী চণ্ডী গ্রন্থেও শিবের সঙ্গে শক্তির কোনও বিশেষ সম্পর্ক নেই।


★ মায়ের বিগ্রহ কষ্টি পাথরে নির্মিত। মা সর্পবাহনা।  


প্রসঙ্গত সর্পমাতৃকা উপাসনার প্রাচীন প্রথা উপমহাদেশে হরপ্পা সভ্যতা থেকে মহাভারত যুগে অনবরত চলেছে, চন্দ্রকেতুগড় গঙ্গারিডাই সভ্যতায় সর্পমাতৃকা মূর্তি পাওয়া গেছে। পালযুগে সমস্ত প্রতিমার মধ্যে সবথেকে বেশি যে মূর্তি পাওয়া যায়, তা হল মনসা বা সর্পমাতৃকা। 


অতএব গুহ্যকালী মূর্তিকল্পে এই সুপ্রাচীন সর্পমাতৃকার স্মৃতিও নিহিত।


★ মা সর্পকুণ্ডলীর ওপর যোগাসীন। দেড় ফুট উচ্চ বেদীটি অনেক সময় ঢাকা থাকে। মা এখানে সর্প উপবীত ধারণ করেন। মা দ্বিভুজা, ডান হাতে বরদান করেন এবং বাম হাতে অভয় দান করেন। মা লোলজিহ্ব। মুণ্ডমালিনী, মুণ্ডের সংখ্যা পঞ্চাশ। মূর্তির দন্ত ও চক্ষু মহাশঙ্খ দিয়ে তৈরি। 


তন্ত্রে মানুষের মাথার খুলিকে মহাশঙ্খ বলে।


মন্দিরের দক্ষিণে পঞ্চমুণ্ডি আসন আছে।


★ শোনা যায় এই মন্দিরে বর্গি হামলা হয়েছিল। বর্গিরা মন্দিরে হামলা করেছে এমন খুব বেশি জানা যায় না। নবাবী আমলে নন্দকুমার বর্গিদের শত্রু বলেই সম্ভবত আক্রমণ, অথবা জরাসন্ধের সঙ্গে আর্যাবর্তর সুপ্রাচীন সঙ্ঘাতের স্মৃতিকেই কি নাগপুরের চিৎপাবন ব্রাহ্মণরা পুনরায় জাগরিত করেন?


কিন্তু বাংলায় বর্গি হামলা যে সময় হয়েছিল, সেটা মন্দির স্থাপনার যে সময়টি জানা যাচ্ছে (১৭৭০ দশক), তার প্রায় তিন দশক আগে। তবে হতে পারে ইতিহাসে কুখ্যাত ওই ফাঁসির ঘটনার সঙ্গে এই মন্দির স্থাপনার কাহিনী পরবর্তী কালে মিশে গেছিল, বাস্তবে হয়ত নন্দকুমার মন্দির স্থাপন ফাঁসির অনেক আগেই করেছিলেন।


মন্দিরে মায়ের অধিষ্ঠান হয়েছিল একটি শনিবার, ১১৭৮ বঙ্গাব্দের ১১ই মাঘ, ইংরেজি ১৭৭২ সালের ২৫শে জানুয়ারি।


প্রসঙ্গত নন্দকুমার একজন দীক্ষিত বৈষ্ণব ছিলেন, মালিহাটির রাধারমণ ঠাকুর তাঁকে দীক্ষা দেন। কিন্তু সভামধ্যে বৈষ্ণব হলেও অন্তরে শাক্ত ছিলেন নন্দকুমার, যা কৌলধর্মের প্রাচীন প্রথা, তিনি গোপনে শক্তি সাধনা করতেন। গুহ্য সাধনা করতেন বলেই গুহ্যকালীর শরণ নিয়েছিলেন।


★ মন্দিরের চূড়া নন্দকুমার শেষ পর্যন্ত নির্মাণ করেন নি। এ সম্পর্কে একাধিক কাহিনী প্ৰচলিত। মা স্বয়ং নন্দকুমারকে স্বপ্ন দিয়ে চূড়া নির্মাণে নিষেধ করেন, অথবা নন্দকুমারের ফাঁসির পরে চূড়া আর নির্মিত হয়নি, অথবা ফাঁসির পরে চূড়াটি বজ্রপাতে ভেঙে গেছিল। 


তবে মন্দিরের চূড়া ২০০৪ সালে নবনির্মিত হয়েছে।


★ তন্ত্রসার গ্রন্থে মা গুহ্যকালীর ধ্যানমন্ত্র এরকম। তাঁর গাত্রবর্ণ গাঢ় মেঘের ন্যায়; তিনি লোলজিহ্ব ও দ্বিভূজা; পঞ্চাশ নরমুণ্ডের মালা ধারণ করেন, মায়ের কটিতে ক্ষুদ্র কৃষ্ণবস্ত্র। মায়ের স্কন্ধে নাগযজ্ঞোপবীত। মায়ের মস্তকে জটা ও অর্ধচন্দ্র। কর্ণে শবদেহরূপী অলংকার। মা  চতুর্দিকে নাগফণাবেষ্টিতা ও নাগাসনে উপবিষ্টা। বামকঙ্কণে তক্ষক সর্পরাজ ও দক্ষিণকঙ্কণে অনন্ত নাগরাজ। মা নবরত্নভূষিতা। তিনি অট্টহাস্যকারিণী, মহাভীমা, সাধকের অভিষ্ট ফলপ্রদায়িনী।


★ বীরভূমের নলহাটি আজিমগঞ্জ শাখায় লোহাপুর স্টেশন থেকে সাত কিলোমিটার দূরে ভদ্রপুর গ্রাম। তারাপীঠ থেকেও বাসে আসা যায়। তবে নলহাটি স্টেশন থেকে বহরমপুরের দিকে যাওয়ার বাসে চেপে বারো কিলোমিটার দূরে নগড়া মোড়ে নেমে টোটো চেপে গুহ্যকালী মন্দির মাত্র চার কিলোমিটার।


★ মন্দিরে তন্ত্রমতে পুজো হয়, ছাগবলি হয়। রোজ দুপুরে মাকে মাছের টক দিয়ে নিত্যভোগ দেওয়া হয়। তবে কার্তিকী অমাবস্যায় কালীপুজোর সময় রাতে কোনও পুজো হয় না, কারণ মা গুহ্যকালী প্রত্যেক রাতেই শ্মশানে ভ্রাম্যমাণ থাকেন বলে কথিত আছে। এজন্য রাতে কোনও পুজো হয় না।


 


ছবিতে মা গুহ্যকালীর বিগ্রহ, মন্দির, এবং মগধের লৌকিক মাতৃকা জরার একটি কাল্পনিক চিত্র।


জয় জয় মা।

No comments