Page Nav

HIDE

Grid Style

GRID_STYLE

Post/Page

Weather Location

Breaking News:

latest

অন্ধকারে সংলাপ —আশিস কুমার পণ্ডা

অন্ধকারে সংলাপ —আশিস কুমার পণ্ডা
হায়দরাবাদের মাধাপুরে এমন একটি রেস্টুরেন্ট আছে, যা অন্য সব রেস্টুরেন্টের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। রেস্টুরেন্টটির নাম "Dialogue in the Dark (অন্ধকারে সংলাপ)"। নামটির মধ্যেই যেন লুকিয়ে আছে একট…

 



অন্ধকারে সংলাপ —আশিস কুমার পণ্ডা


হায়দরাবাদের মাধাপুরে এমন একটি রেস্টুরেন্ট আছে, যা অন্য সব রেস্টুরেন্টের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। রেস্টুরেন্টটির নাম "Dialogue in the Dark (অন্ধকারে সংলাপ)"। নামটির মধ্যেই যেন লুকিয়ে আছে একটি গল্প। আর সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, এখানকার বেশির ভাগ কর্মীই দৃষ্টিহীন।

রেস্টুরেন্টের ভেতরে ঢোকার আগে আপনার ফোন, ঘড়ি, এমনকি সামান্য আলো বেরোতে পারে এমন সব জিনিস বাইরে রেখে দিতে বলা হবে। দরজা বন্ধ হবে। আর হঠাৎ করে যেন সব হারিয়ে যাবে— কিছুই থাকবে না। না আলো, না ছায়া, না কোন আকার। থাকবে শুধু অন্ধকার। নিকষ কালো অন্ধকার। আপনি প্রথমে একটু ভয় আর দ্বিধা নিয়ে হাঁটা শুরু করবেন। তবে আপনাকে একটি সাদা ছড়ির সাহায্যে কীভাবে পথ চিনে চলতে হয়, তা শেখানো হবে। সত্যি বলতে, যখন আপনি কিছুই দেখতে পাবেন না, তখন শব্দ ও গন্ধকে একেবারে নতুনভাবে অনুভব করবেন। চারপাশের পৃথিবীকে যেন অন্য এক দৃষ্টিকোণ থেকে চিনতে পারবেন।

তারপর একজন গাইড আপনাকে ধরে টেবিল পর্যন্ত নিয়ে যাবেন। ভেতরে কোন মেনু নেই যে পড়বেন। কোন সাজানো খাবার নেই যে দেখবেন। কোন  রঙ নেই যে বিচার করবেন। কোন  সূত্রই পাবেন না। কিছুক্ষণ পরে খাবার পরিবেশন করা হবে। কিন্তু কী পরিবেশন করা হয়েছে, তা আপনি জানতে পারবেন না। আপনাকে সবকিছু বুঝতে হবে স্পর্শ, গন্ধ এবং স্বাদের মাধ্যমে।

আঙুলে কিছু ভেজা ভেজা ঠেকবে—হয়তো ডাল, বা রায়তা!

কিছু একটা শুকনো— হয়তো সবজি।

কিছু একটা গোল— রুটি নাকি বড়া?

জীবনে এই প্রথম আপনি চোখের সাহায্য ছাড়া খাবার খাওয়ার চেষ্টা করবেন। ধীরে ধীরে একটা অদ্ভুত অনুভূতি জন্ম নিতে থাকবে। যে কাজগুলো এতদিন কত সহজ মনে হতো, সেগুলোই হঠাৎ কঠিন হয়ে যাবে। বাটি খুঁজে পাওয়া, চামচ কোথায় বোঝা, এমনকি কোনটা কোথায় রাখা আছে তা আন্দাজ করাটাও যুদ্ধের মতো লাগবে। কয়েক মুহূর্ত আগেও যা ছিল অতি সাধারণ, এখন তাই হয়ে যাবে অসাধারণ।

প্রায় ত্রিশ মিনিট ধরে আপনি অন্ধকারে বসে খাবার খাবেন—হাতড়ে, আন্দাজ করে, খুঁজে খুঁজে, আর সেই সব ইন্দ্রিয়ের ওপর ভরসা করে যা নিয়ে আপনি কখনো ভাবেননি। আর প্রতি মুহূর্তে আপনি উপলব্ধি করতে শুরু করবেন, আপনার জীবনের কতটা নির্ভর করে এমন একটি উপহারের উপর, যার জন্য আপনি কখনো কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেননি।

তা হলো দৃষ্টিশক্তি—প্রতিদিনের এত সাধারণ একটি সঙ্গী যে, এর গুরুত্ব আমরা তখনই উপলব্ধি করি, যখন কয়েক মুহূর্তের জন্যও পৃথিবীটা অন্ধকার হয়ে যায়।

একসময় খাওয়া শেষ হবে। কেউ আপনার হাত ধরে আবার আলোয় ফিরিয়ে আনবেন। কিন্তু তখন শুধু পৃথিবীটাকে নতুন করে দেখবেন না, নতুন করে অনুভবও করবেন। হয়তো আপনার চোখ ভিজে উঠবে। খাবারের জন্য নয়। অন্ধকারের জন্যও নয়। বরং এই উপলব্ধির জন্য যে, এতদিন আপনি কত বড় বড় আশীর্বাদের মধ্যে বেঁচে থেকেও সেগুলোর মূল্য বুঝতে পারেননি। যে চোখ দিয়ে আপনি পৃথিবী দেখেছেন, সেই চোখের জন্য আপনি শেষ কবে ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিয়েছেন—সেটাও হয়তো মনে করতে পারবেন না।

আপনি বছরের পর বছর ধরে যা নেই তা নিয়ে অভিযোগ করেছেন, কিন্তু যা আছে, তার জন্য কখনো ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানাননি।

আমরা অনেকেই ঠিক এভাবেই বাঁচি। যা নেই, তার দিকেই আমাদের দৃষ্টি এত বেশি থাকে যে, জীবনে ইতিমধ্যেই থাকা অসংখ্য আশীর্বাদের কথা আমরা ভুলে যাই।  সারাজীবন আমরা সেই একটি খালি বাটির দিকে তাকিয়ে থাকি, আর পাশে রাখা পাঁচটি ভরা বাটির কথা ভুলে যাই। যা নেই, তার জন্য আফসোস করি। যা আছে, তার জন্য কৃতজ্ঞ হই না।

কৃতজ্ঞতা মানে এই নয় যে জীবনটা নিখুঁত। এর মানে হলো, জীবন নিখুঁত না হলেও, তার মধ্যেও কৃতজ্ঞ হওয়ার মতো কিছু আছে — এটা বুঝতে পারা।

ফোনে মায়ের গলা। পাশের ঘর থেকে ভেসে আসা সন্তানের হাসি। কোন কারণ ছাড়াই এক বন্ধুর ফোন। মেশিন ছাড়াই নিঃশ্বাস নিতে পারা। আরেকটা নতুন সকাল দেখতে পাওয়া। এসব এত সাধারণ যে আমরা খেয়াল করি না। অথচ এগুলোই আমাদের জীবনকে সত্যিকারের ধনী করে। এগুলো এমন উপহার, যা টাকা দিয়ে কেনা যায় না, সাফল্য দিয়েও নিশ্চিত করা যায় না।

সবচেয়ে সুখী মানুষ তারা নয়, যাদের সব কিছু আছে। সবচেয়ে সুখী তারা, যারা যা আছে তার মূল্য বুঝতে শিখেছে।

তাই অভিযোগের হিসাব নয়, আশীর্বাদের হিসাব করুন।

এক মুহূর্ত থামুন। চারপাশে তাকান। আর বলুন—

“ধন্যবাদ।”

কারণ কখনও কখনও কয়েক মিনিটের অন্ধকারই আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আমাদের জীবনে কতটা আলো ইতিমধ্যেই আছে।

No comments